মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৭, ২০২১
-3.3 C
Toronto

Latest Posts

এ জীবন চায় নি মমতাজ

- Advertisement -

মেঘনা নদীর যে অংশ দক্ষিণ দিকে এসে কিঞ্চিৎ এঁকে বেঁকে গেছে সেখানে দাঁড়ালে আজও কেউ কেউ মাঝ নদী থেকে ভেসে আসা আযান শুনতে পায়।

- Advertisement -

ঘটনাটি একটু খুলেই বলি।

কাজের সন্ধানে এদিক সেদিক ঘুরে মেহের আলি নামের এক যুবক অচেনা অজানা এক গ্রামে এসে হাজির হয়েছিল। মাদ্রাসার পড়া লেখা শেষ করতে পারেনি অথচ এরই মধ্যে তার চাকরির প্রয়োজন দেখা দিল। মেহের আলির ইচ্ছে ছিল সে অন্তত ‘ফাযিল’ পাশ করবে। কিন্তু খেয়ে-পরে থাকা যায় এমন একটি চাকরির খোঁজ করতে করতে এতদূর চলে আসা। হাওলাদার বাড়িতে এসে সরাসরি বাড়ির মুরব্বির মুখোমুখি হলো সে।

নোয়াখালী থেকে এতদূর আইছো কিন্তু পথে কোন কাজ পাইলা না?

মুরব্বির প্রশ্নের জবাবে মেহের আলী বলে, গত রাতে স্বপ্নে এক দরবেশ আমাকে বললো নদীর ঘাট থেকে সড়কে উঠে দুপুর পর্যন্ত হাঁটতে থাকবি। তারপর এইরকম একটা বাড়ির বর্ণনা দিয়ে দরবেশ বলেছিল বাড়ির মুরব্বীর কাছে যদি ঠিক মতো বলতে পারিস তবে তিনি তোকে চাকরিতে রেখে দিবেন। মুরুব্বি,আপনার নেয়ামতের দানাপানি আমার ভাগ্যে লেখা আছে। আল্লাহর রহমত পাবেন যদি থাকার অনুমতি দেন।

হাদিসে উল্লেখ আছে যে লোক দুনিয়াতে অন্য কারো অভাব দূর করে দেয়, তার দুনিয়া ও আখিরাতের অসুবিধাগুলোকে আল্লাহতা’আলা সহজ করে দিবেন।

হাওলাদার বাড়ির মুরুব্বী জিজ্ঞেস করলেন কোন হাদিসে আছে?

তিরমিযী শরীফ১৯৩০। মেহের আলি বিনয়ের সুরে চাকরি পাবার জন্য অনেক কথাই বললো কিন্তু স্বপ্নের কিছু কথা গোপন রেখে দিলো।

ঠিক আছে দিনে পাঁচবার আযান দিবা। শুক্রবার রাতে তেলাওয়াত করবা আর বাড়ির বউ ছেলেমেয়েদের কোরান হাদিসের ফজিলত বর্ণনা করবা।

একটি পাকা ঘর এবং সেটার তিনদিকে তিনটি টিনের দোচালা। হাওলাদার সাহেবের তিন স্ত্রী থাকেন পৃথক পৃথক ঘরে। তিনি নিজে থাকেন পাকা ঘরের দক্ষিণ দিকে। সেই ঘরের মাঝখানের দুটি বাদ দিয়ে শেষের ঘরটি খালি পড়েছিল। সেখানেই মেহের আলীর থাকার ব্যবস্থা করা হলো।

হাওলাদার সাহেবের তিন স্ত্রীর ঘরে সাত সন্তান। ছোট স্ত্রীর ঘরে পর পর দুইটি পুত্র ছাড়া বাকী সব কন্যা। সবচাইতে বড় কন্যার নাম মমতাজ বেগম। মেহের আলি স্বপ্নে এক যুবতি কন্যার পায়ে মল দেখেছে। তার আওয়াজও শুনেছে। হতে পারে মমতাজ বেগমই সেই যুবতি কন্যা। স্বপ্নে দেখা দৃশ্যের সাথে বাড়ির চেহারা ঠিক ঠিক মিলে গেছে। তাহলে পায়ের মল কেন শুনতে পাচ্ছে না! স্বপ্ন তো স্বপ্ন। বাস্তবের সাথে তার কতটুকুই বা মিল থাকে। কিন্তু মেহের আলি স্বপ্নটা দেখেছিল সুবহে সাদিকের সময় তাই স্বপ্নের বাকী অংশটুকুতে সে ভরসা রাখে। তার বিশ্বাস হঠাৎ একদিন প্রথমে সে শুনতে পাবে মলের আওয়াজ, তারপর দেখবে পা এবং সবশেষে সেই যুবতিকে। এরপর হবে বাকী কথা।

মেহের আলির কণ্ঠে কোরান তেলাওয়াত শুনে হাওলাদার সাহেবে খুবই সন্তুষ্ট। তার আযানও খুব সুমধুর। মেহের আলির বয়স অল্প তাই তাকে মসজিদের ইমাম করছেন না। পারলে মসজিদের ইমামতিও তাকে দিয়ে করাতেন।

প্রতি শুক্রবার কোরান তেলাওয়াত করে সে যখন বাড়ির মহিলা ও কন্যাদের শোনায় তখন জানালার পাশে অনেক চুড়ির আওয়াজ পাওয়া যায়, আস্তে ধীরে কথা শোনা যায়। কেউ একজন খুব চেপে কান্নাকাটিও করেন। কোরান তেলাওয়াতের সময় হাওলাদার বাড়ির রাখাল, মাঝি, কাজের লোকজন মেহের আলির সামনে মাদুরের উপর বসে থাকে। তাদের মধ্যেও কেউ কেউ কোরান তেলাওয়াত আর বয়ান শুনে চোখের পানি ফেলে। সব সময় না পারলেও বৃদ্ধ হাওলাদার সাহেবও কাঠের চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ তেলাওয়াত শুনে ঘুমাতে যান।

দেখতে দেখতে দুই মাস হয়ে গেল কিন্তু পায়ের মলের কোন চিহ্ন পাওয়া গেল না। রুস্তুম নামে ছোট একটি কাজের ছেলে ছিল। তার সাথে ভাব করে নিলো মেহের আলী। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যা জানার তা জেনে নিলো রুস্তুমের কাছ থেকে। যিনি মেহের আলির সুরেলা কণ্ঠের তেলাওয়াত শুনে মাঝে মাঝে কেঁদে ফেলেন তিনি হলে হাওলাদার বাড়ির বড় বৌ। এ বাড়িতে শুধু একজনই পায়ে মল পরতো সে হলো বড় বেগমের বড় কন্যা মমতাজ বেগম। কোরান তেলাওয়াত এবং ধর্মীয় বয়ানের কারণে তাকে বারণ করা হয়েছে পায়ে মল না পরতে। মেহের আলি সেই ভুল ভাঙ্গিয়ে দেয়। তবে রুস্তুমকে সাবধান করে বলে এই কথা শুধু মমতাজের কানে কানে গিয়ে বলতে হবে। আর কেউ যেন কিছু শুনতে না পারে।

একদিন মেহের আলি ঘুমাবার আগে একা একাই নিচু সুরে কোরান তেলাওয়াত করছিল। সামনে কেউ বসা ছিল না কিংবা জানালার পাশেও না। এমন সময় থেকে থেকে ঝুনঝুন শব্দ কানে এসে লাগলো। যেন বিড়ালের পায়ে মল বাঁধা হয়েছে। সেভাবেই পা টিপে টিপে কেউ জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। রাত তখন কত হবে? দশ কিংবা এগারোটা। যে বাড়িতে মাগরিবের আগেই রাতের খাওয়া শেষ করে যেযার মত নিজ নিজ ঘরে ইশার নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে যায়, সে বাড়িতে এই সময় জানালার কাছে দম বন্ধ করে আছে এক জোড়া ঝুনঝুন শব্দ। শুকরিয়া নামাজই পড়া উচিৎ ছিল কিন্তু মেহের আলি উত্তেজনায় ভুলে যায় সে কাজ করতে। বরং হাত উঁচু করে বলে, আলহামদুলিল্লাহা।

হে পরওয়ারদিগার আপনি আমাকে মাফ করে দেন। এক মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু কথা ঘুরিয়ে বলেছি। এত মানুষের মধ্যে সঠিক মানুষ চেনার আর কোন তরিকা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হে আল্লাহ, আপনি যা করেন মঙ্গলের জন্য করেন। আমি চাকরির জন্য পথে পথে ঘুরেছি। কোন কোন দিন না খেয়ে থেকেছি। হাঁটতে হাঁটতে পায়ে ফোস্কা পড়ে গেছে অথচ তখন জানতাম না এই বিশাল পরিবারে আমার ভাগ্য লেখা আছে। এক দরবেশ স্বপ্নে আমাকে এই বাড়িটি দেখিয়ে বলেছেন হাওলাদার সাহেব দিলের মহব্বত দিয়ে আমাকে আশ্রয় দিবেন। দরবেশের আরেক কথা মতো আজ মহব্বতের আওয়াজ শুনতে পেলাম। কিন্তু আপনার এই পেয়ারা বান্দা জানে না যে ঘুঙুর হলো শয়তানের বাদ্যযন্ত্র। একদিন মা আয়েশা (রা.) এর নিকট এক বালিকা বাজনাদার নূপুর পরে এলে তিনি তাকে বলেছিলেন, নূপুর কেটে না ফেলা পর্যন্ত আমার ঘরে প্রবেশ করবে না। তিনি আরও বলেছিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ঘরে ঘণ্টি থাকে সেই ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না।এ কথা সহী মুসলিম হাদিসে লেখা আছে।

মেহের আলি হাত উঁচু করে সুরে সুরে বলে যাচ্ছে তার কথা। হেআল্লাহ, আপনার সেই পেয়ারা বান্দা ইনশাল্লাহ আজ তওবা করবেন। আপনি তার জানা অজানা গুনাহ মাপ করে দেন। আপনি আমাদের সকলকে বিপদ মুক্ত রাখেন। আমাদের সাবধানতার সাথে মিল মহব্বত করার সুযোগ দেন। এই গভীর রাতে আমি চাঁদের আলো দেখতে পেলাম না। তবে হে পরওয়ারদেগার, আপনার রহমতের জন্য ধৈর্য ধরে যুগ যুগ অপেক্ষা করতে রাজি আছি। ইনশাল্লাহ আজ ফজরের আযান আরও সুমধুর হবে।

ফজরের আযান সত্যি সত্যি এতো মধুর হলো যে হাওলাদার সাহেব পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বের করে মেহের আলির হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, বাবা মেহের আলি আর একবার আমাকে ‘হাইয়া আলাস সালাহ’ এই অংশটা মুখে মুখে শুনাইবা। পঞ্চাশ টাকা মেহের আলির কাছে অনেক টাকা। সে হাওলাদার সাহেবের মহান দিলের প্রতি আরো বেশি আকৃষ্ট হোল। মেহের আলি দুই কানে হাত দিয়ে ‘হাইয়া আলাস সালাহ’ থেকে ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ পর্যন্ত শুনিয়ে মুরুব্বির হাতে হাত রেখে দোয়া চাইলো।

পরেরদিন নদীর ঘাটে মুদির দোকানে গিয়ে এক সের বাতাসা কিনলো মেহের আলি। দোকানদার বললো এত বড় নোটের ভাংতি নাই। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি লাগানো লাল নোটটি উলটে পালটে দেখে মেহের আলি বলে, জাতির পিতার ছবি লাগানো টাকা ছাড়া আমার কাছে আর কোন টাকা নাই। দোকানদার বললো, আপনি হাওলাদার বাড়ির হুজুর, নুরানি চেহারা আপনার। কী সুন্দর লম্বা লম্বা দাড়ি। আপনারে দেখতে ফেরেশতার মত লাগে। আপনি এক সের বাতাসার পয়সার জন্য চিন্তা করেন ক্যান। যখন মন চায় আইসা দিয়া যাবেন। এই গেরামে লোকজন তেমন নাই। বেচাকেনা এমনিতেই বন্ধ। আমার যাওয়ার কোন যায়গা নাই, প্রয়োজনও নাই তাই দোকান খুইলা বইসা থাকি। মিলিটারিরা আইসা যেদিন ঘাটে নামে সেইদিনই কলা বিস্কুট সব ফ্রিতে নিয়া যায়। আল্লাহ একদিন ওগোর বিচার করবে।

মেহের আলি দোকান ত্যাগ করার আগে মুদির মাথায় হাত রেখে উচ্চারণ করে; আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াক।

শুক্রবার রাতে বয়ানের আগে মেহের আলি বাতাসার ঠোঙ্গা রুস্তুমকে দিয়ে বলে, সবার মধ্যে বাতাসা বিলিয়ে দিতে এবং যা বাঁচবে তা তিন ঘরে সমান ভাগ করে রেখে দিতে। এরপর সে অপেক্ষা করে মহিলাদের জানালার কাছে এসে বসার জন্য। বিশেষ অপেক্ষা মমতাজের জন্য। মেহের আলি শুরু করলো এই বলে যে, আমি এখন সূরা আর রহমান থেকে তেলাওয়াত করবো। এই সূরা মদিনায় অবতীর্ণ এবং এর আয়াত সংখ্যা ৭৮। একটি মনোরম পরিবেশ তৈরী হয়ে যায় যখন মেহের আলি পবিত্র কোরান তেলাওয়াত করে। কেউ কথা বলে না, কেউ শব্দ করে না।

সে রাতে কাঠের জানালা হাল্কা খোলা ছিল। তারই ফাঁক দিয়ে মমতাজ বেগম নূরানি চেহারার মেহের আলির দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকে। এই প্রথম নয়, মমতাজ বেগম এর আগেও কয়েকবার জানালার ফাঁক দিয়ে মেহের আলিকে দেখেছে কিন্তু মেহের আলি এখনো মমতাজ দর্শন করেনি। সুন্দর ফর্সা গালে কালো কুচকুচে দাড়ি, চোখে সুরমা, মাথায় সাদা পাগড়ী। মমতাজের মনে হলো সে সামনে গিয়ে হাজির হয়ে বলে- আমাকে কবুল বলতে হুকুম করো মেহের আলি। আমি বিলম্ব ছাড়াই পরপর তিনবার কবুল বলে দিব।

মেহের আলি বুঝতে পারে, সবাই চলে গেলেও মমতাজ এখনো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে রকম হাল্কা কিছু শব্দ হলো জানলার কাছে। সে বললো শুক্রবার রাতে বিলম্ব না করে ঘুমাইতে যাওয়া অতি উত্তম। খুব ভোরে উঠে তাহাজ্জত পড়লে অনেক সোওয়াব। চাপকলের কাছে সুবহে সাদিকের সময় পানি পড়ার শব্দ শুনলে বুঝবো আল্লাহর এক পেয়ারা বান্দা তাহাজ্জত পড়া শুরু করছে। শুধু কোন কিছুর আঘাত দিয়া চাপকলে অতিরিক্ত একটা শব্দ করলেই হবে। হে আল্লাহ আপনি বান্দার নেক নিয়ত কবুল করে নিয়েন।

মেহের আলির কথা শেষ হতেই জানালায় ক্যাচ করে একটি শব্দ হলো। তারপর সব নীরবতা মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। মেহের আলি মনে মনে বলে হে আল্লাহ, আপনাকে বলেছিলাম চাঁদ বদন দেখার জন্য হাজার বছর অপেক্ষা করতে পারি তাই বলে সে কথা আপনি মনে ধরে রাখবেন না।

শনিবার সকালে রুস্তুমকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল মেহের আলি। চরে গিয়ে হাওলাদার সাহেবের কিছু জমি জমা দেখে বললো মাশাল্লাহ। এক টুকরো মাটি তুলে দোয়া পড়ে ফুঁ দিলো যাতে হাওলাদার সাহেবের জমিতে বরকত হয়। এরপর রস্তুমকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে সে বাতাসার পয়সা দিতে চলে আসে নদীর ঘাটে। মেহের আলি জানতো না সেখানে মিলিটারি এসে বসে আছে।

তোমাকে তো এখানে আগে দেখি নাই। তুমি কে? দোকানদার নিজ থেকে এই প্রশ্নের জবাব দিয়ে বলে, কুদ্দুস মিয়া, ইনি হাওলাদার বাড়ির মসজিদে আযান দেন। দুই মাস আগে এই গেরামে আইছে।

কুদ্দুস রাজাকার যেন আকাশের চাঁদ পেয়ে গেল। মেহের আলির গলা চেপে ধরে বললো, এই ব্যাটা তোর নাম কী? সাথে সাথে চা খাওয়া ছেড়ে দুইজন মিলিটারি বন্দুক উঁচিয়ে ধরল মেহের আলির বুকের ওপর।

মেহের আলির দাড়ি টেনে পরীক্ষা করে দেখে সেটা আসল না নকল। হাঁটুর উপর লুঙ্গি উঠিয়ে দেখে ক্রলিং করার দাগ আছে কিনা। হাওলাদার মুরুব্বিরে এত করে বলা হলো শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য অথচ সে কিছুতেই রাজি হয় না। কুদ্দুস মিয়া তাই হাওলাদারকে শাস্তি দিতে চায়। ওর টিনের ঘরগুলো খুলে নিতে চায়। গোয়াল ঘরে শুধু শুধু ছয় সাতটা গরু। সেগুলোর অর্ধেক তার চাই। যদিও দোকানে বসে চা খাচ্ছিল কিন্তু কিছুক্ষণ আগে সে চারজন মিলিটারিকে পাঠিয়ে দিয়েছে হাওলাদার বাড়ি পরীক্ষা করে আসতে। এত বড় বাড়ি হয়তো মুক্তিদের জন্য কোথাও অস্ত্রপাতি জমা করে রেখেছে। এছাড়াও কুদ্দুস মিয়া গত সপ্তাহে জানতে পারে হাওলাদার সাহেবের বড় বড় কন্যা আছে। তারা চোখে ধরার মত সুন্দরী। হাই স্কুলের পাকা দালানে মিলিটারি ক্যাম্প। সেখানকার ইনচার্জ সদ্য পাঞ্জাব থেকে আসা ক্যাপ্টেন আসলাম খান। আসলাম খানের টেস্ট জানে সুবেদার সাহেব। তাই সে নিজে গেছে হাওলাদার বাড়ি। ক্যাপ্টেন আসলাম বলেছে সে হিন্দু মেয়ে চায় না। মুসলমান ঘরের নম্র ভদ্র নামাজি মেয়ে তার বেশি পছন্দ।

মেহের আলিকে গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। সুবেদার অস্ত্র খোঁজার নামে ক্যাপ্টেন আসলাম খানের সুখ খুঁজে পেয়েছে। খুশিতে হাওলাদার সাহেবকেও নদীর ঘাটে নিয়ে এসেছে সুবেদার। মুদি দোকানের কাছে এসেই চোখ ইশারায় কুদ্দুসকে বললো, তুমি যা বলেছ সব সত্য হ্যায়।

সুবেদার এখন কুদ্দুসের পক্ষে এসে গেছে। যত চোট ততো ভোট। হাওলাদার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান না হোক এবার সে নিজেই চেষ্টা করবে সেই পদ দখল করার। খুচরা রাজাকারগিরি আর ভালো লাগে না। হোক সে অন্য গ্রামের লোক। বেশিরভাগ সময় চলাফেরা করে মিলিটারির গানবোটে। এই সুযোগ হাত ছাড়া করবে না সে।

হাওলাদার চোখ নিচে করে দাঁড়িয়ে আছে। মেহের আলির জন্য দুইবার মুখ খুলে সে ধমক খেয়েছে। কুদ্দুস মিয়া তাকে ধমক দিয়ে বলেছে মুক্তির স্পাই ঘরে রাখছেন হাওলাদার সাহেব। নিজের জান নিয়ে চিন্তা করেন। ওতো আপনার কোন আত্মীয়স্বজন না, এতো মায়া দেখান ক্যান? নোয়াখালী জেলার লোক। আইছো ভেদরগঞ্জ। আমাদের ঠিকমত হিসাব মিলাইতে দেন। নাম্বর ওয়ান, আপনি শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হইতে চান না। নাম্বর টু, আমরা বাজারে বইসা চা খাইতেছি এই ব্যাটা ঠিক তখনই রেকি করতে আইসা হাজির হইলো। থ্রি, আপনি এই ছেলের বাপ-চাচার নাম ঠিকানা কিছুই জানেন না। ফাইনালি, এই ছেলের হাঁটুতে কনুইতে কালো দাগ। দেশের ক্যাপ্টেন আজ রাইতে আইসা সহী বিচার করবো। ততোক্ষণ আপনি যাইয়া ক্যাপ্টেন সাহেবের খাবার দাবারের ইন্তিজাম করেন। সব মিলাইয়া দশ বারোজনের খাবার হইলেই চলবে। ধরেন মাগরিব নামাজের সময় ক্যাপ্টেন সাহেব আইসা হাজির হবেন। আপনার মোয়াজ্জেম এখন আমাদের জিম্মায় থাকবো। আণ্ডার এরেস্ট।

মাথা নিচু করে বাড়ির দিকে রওনা হওয়ার আগে হাওলাদার একবার চোখে চোখ রেখে মেহের আলিকে বললো, বিপদের দিনে জীবনের ঝুঁকি নিয়া এতো দূরে কেন আসতে গেলা বাবা। হাওলাদার সাহেবের ভয় দুঃখ সবই তার চোখে মুখে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। কিন্তু মেহের আলির ঠোটের কোনায় হাসি। সে বলতে পারছে না স্বপ্নের শেষে কী দেখেছিল। শেষ দৃশ্যে দেখেছিল বিপদের চিহ্ন। কিছু বদ জিন এসে মেহের আলি আর রূপবতী রাজকন্যাকে পৃথক করে দিবে। এরপর দুইজনকে নিয়ে তারা দুই ভিন্ন ভিন্ন পাহাড়ের দিকে উড়ে যাবে। মেহের আলি যখন রাজকন্যা রাজকন্যা করে চিৎকার করবে সে ঝুনঝুন ঝুন শব্দ ছাড়া কিছুই শুনতে পাবে না। ধীরে ধীরে যা মিলিয়ে যাবে অন্ধকার পাহাড়ের চূড়ায়।

মুরুব্বির সামনে কোন দুর্বলতা না দেখালেও মমতাজের কথা মনে হতেই মেহের আলির দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ক্যাপ্টেন এসে তাঁকে সিগারেটের আগুন দিয়ে ছেঁকা দিয়েছে। পায়ের উপর বুট দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করেছে। সুপারি কাটার সরতা দিয়ে একটা আঙ্গুল কেটে দিয়েছে। তবুও ক্যাপ্টেনের কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে নি মেহের আলি। ক্যাপ্টেন অনেক কিছু জানতে চাইলেও মেহের আলি সব কথার উত্তর দেয় ইয়া আল্লাহ ইয়া আল্লাহ বলে।

এদিকে কুদ্দুস রাজাকার মেহের আলির সামনে পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেনকে বুঝিয়ে দিয়েছে ওকে মেরে ফেললে বৃদ্ধ হাওলাদার সব কাজ সহজেই করতে রাজি হয়ে যাবে। ক্যাপ্টেনের কাজ হবে হাওলাদার বাড়িতে পা রেখেই মুরুব্বিকে প্রথম খবর দেওয়া যে মেহের আলিকে খতম করা হয়েছে। এরপর আর হাওলাদার সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। কথাটা ক্যাপ্টেনের খুব পছন্দ হলো।

ক্যাপ্টেন বললো, তোকে শেষ সুযোগ দিচ্ছি। বল তোর কমান্ডারের নাম কী? মেহের আলি বললো, আমি খুব ভালো আযান দিতে পারি, এখন মাগরিবের নামাজের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। আমি আযান দেই?

যুদ্ধের দিনে সব গ্রামই ফাঁকা ছিল। দিনের বেলাতে যেখানে কোন লোকজন দেখা যেত না তখন সন্ধ্যার পর তো সব নীরব শান্ত, হিমালয়ের চূড়ার মতো। নদীর ঘাট থেকে হাওলাদার বাড়ি খুব বেশি দূর না। তাও কণ্ঠস্বর অতো দূর যদি না পৌছায়! যতটা সম্ভব গলা ফাটিয়ে মেহের আলি সেদিন মাগরিবের আযান দিয়েছিল।

- Advertisement -

Latest Posts

Don't Miss

Stay in touch

To be updated with all the latest news, offers and special announcements.