সোমবার, এপ্রিল ১৫, ২০২৪
16.3 C
Toronto

Latest Posts

দুলওয়ালী দিল খালি

- Advertisement -

অন্টারিও প্রদেশে আবার ‘স্টেট অব ইমার্জেন্সী’ শুরু হয়েছে। বাজার করে রাখা দরকার। ‘কসকো’ দোকানটায় আমার খুব যাবার শখ। ওখানে কেনাকাটা করতে মেম্বারশিপ কার্ড লাগে। নর্থ আমেরিকায় মনে হয় আমিই একমাত্র পাবলিক যার এই কার্ড নাই। গাট্টি ধরে কিনলে অনেক সস্তা। বাংলায় যেটাকে বলে পাইকারি। চিশতী’র ঐ কার্ড আছে বিধায় ফোন দিলাম, দোস্ত তোর খবর-সবর ভালো?

- Advertisement -

– কী কবি ক…

– তোর না কসকো’র কার্ড আছে?

– লাগবে কখন তাই বল..

– আজকে ইকটু নিতাম

– আমিও যাচ্ছি। এখন যাবি?

– চল

– তুই গত চৌদ্দ দিনে কারো বাসায় গেছিস?

– না তো?

– কেউ বেড়াতে আসছিলো?

– কোই.. না?

– কাশি, জ্বর, গলাব্যথা, গন্ধ না পাওয়া- এসব সিম্পটম?

– এসবের বালাইও নাই। আশেপাশের এপার্টমেন্টে থেকে যে রান্নার গন্ধ ছুটছে রে দোস্ত… স্যুপ, বারবিকিউ, মাছ ভাজা..

– ঠিক বারোটায় তোর বাসার সামনে থাকবো- বলে লাইন কেটে দিলো।

.এরশাদ টাইপের স্বৈরাচার মানুষদের সাথে পেরে ওঠা যায় না। অমুক সময়ে আসবো বললেই হলো? বারোটা বাজতে পনেরো মিনিট বাকি। চিশতী আসতেছে শুনলেই আমার বড় বাথরুম চাপে। আর টেনশনে সবকিছু আটকে যায়।

আমি ঠিক সোয়া বারোটায়, পনেরো মিনিট লেইটে নিচে নামতেই সে একটা পিস্তল বের করে ঠিক আমার মাঝ কপাল বরাবর তাক করলো। এই পজিশনে গুলি খেলে সেকেন্ডের হাজার ভাগের এক ভাগ সময়েই পটল তুলবো। আমি লেনিনের মূর্তির মতো ঠাঁই দাঁড়িয়ে চোখ বুজে ফেললাম। সে ট্রিগার টিপে দিয়ে শান্ত গলায় বলল, থার্টি ফাইভ।

পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস মানে নরমাল থেকেও কম। ঠান্ডায় বাইরে দাঁড়ানোর কারণে। আমি গাড়ির ভেতর বসে পায়ের কাছে পলিথিনের ব্যাগটা রাখতেই সে জিজ্ঞেস করলো, কী ওর মধ্যে?

– লাঞ্চ

– বাজারে গেলেও তোর লাঞ্চ লাগে? তোর জন্ম যদি সুদানে হতো? খিদের চাইতে দুঃখেই মারা যাইতি! কী আনছিস?

– খিচুড়ি, ডিম্ ভাজি

– ভাবি কী রানতেসে?

– গরু, করল্লা ভাজি, ডাল

– এটা তাইলে কী?

– সকাল এগারোটার চা নাস্তা। সিঙ্গারা-পুরির সাবস্টিটিউট।

.

বেশি দামি গাড়িতে আমি একদম কমফোর্ট ফিল করি না। ঝকঝকে, সাদা লেদারে খিচুড়ির হলুদ লেগে গেলে সে নিশ্চিত আমাকে নামিয়ে দেবে। মাঝে মাঝে স্টিয়ারিং থেকে হাত সরিয়ে নিচ্ছে। গাড়ি একাই চলছে। এই গাড়ি দিয়ে মনে হয় ইচ্ছে করেও একসিডেন্ট করানো যাবে না। সারা গাড়ি জুড়ে মাছির চোখের মতো হাজারটা ক্যামেরা আর সেন্সর লাগানো। কিছুক্ষন পরপর সাইডের কাঁচ সামান্য নামিয়ে বাঁ হাত উঁচু করে সিগারেটের ছাই ফেলছে।

কসকো’তে বিশাল লাইন। আমাদের সামনে এক ব্ল্যাক ভদ্রমহিলা দাঁড়ানো। তার কানে কমসেকম ছয় ইঞ্চি ব্যাসের বিশাল সাইজের চুরির মতো দুল। আমি আঁতকে উঠে বললাম, দোস্ত দুলের সাইজ দেখ!

– দেখার আর জিনিস নাই?

– দুলে টান লাগলে কানের লতি ছিঁড়ে রক্তারক্তি হবে!

– মাইনষের লতি নিয়ে তোর এতো টেনশন? তুই একটা সিক পার্সন!

সে দাঁত কড়মড় এমনভাবে আমার দিকে তাকালো গো… আমার পিলে চমকে উঠে। ঠিক স্পেনের ষাঁড়ের চাহুনী! মাস্ক সেকেন্ডে দুইবার করে বর্ষাকালে ব্যাঙের গলার মতো ফুলতে থাকে। আমার ট্রলির দিকে তাকিয়ে বলল, তুই কি শুধু ডিম্ কিনতেই আসছিস? ফ্রিজে জায়গা হবে?

– বারান্দায় ঠান্ডায় রাখবো

– তা, কয়দিন যাবে?

– দুইশটা তো.. দিনে ছয়টা করে লাগলে ধর… প্রায় এক মাস?

– তোর গল্পে শুধু আপারা লাইক মারে কেন জানিস? এ পর্যন্ত কোনো দুলাভাইকে লাইক মারতে দেখছিস?

.

.

আমরা লিস্ট ধরে বাজার শেষ করে ট্রলি নিয়ে বিশাল লাইনে দাঁড়াই। বিশ মিনিটের আগে মনে হয় না বের হতে পারবো। সে হঠাৎ বলল, রিপন তুই একা বিল দিয়ে বের হতে পারবি? আমি এই ফাঁকে গাড়ির তেল ভরে নি? ওখানেও বড় লাইন

– ওকে

– কার্ডটা রাখ।

দুনিয়ায় অনেক স্বার্থপর মানুষ দেখছি, তার মতো দেখি নাই। দুই ট্রলি সামলাতে হিমশিম খেতে থাকি। পেছনের ভদ্রমহিলাও আমার কাছে এসে আবদার ধরলো, আমার ট্রলিটা একটু দেখবা? বাচ্চার দুধ নিতে ভুলে গেছি। দুই মিনিটেই চলে আসবো।

সেই দুল-ওয়ালী।

কানে মোবাইল নিয়ে কথা বলতে বলতে, হাসতে হাসতে, লেফট রাইট করতে করতে চলে গেলো। তার ট্রলির একটা চাকা নষ্ট। গরুর লেজ থরে টানার মতো করে তারটাও টেনে ধরে লাইন সামলাই। আমার ঘাড়ে এখন তিন ট্রলি! এদিক সেদিক ইচ্ছেমতো ছুটছে। আর যে ভারী! ঠ্যালাগাড়ি থামানোর সময় যেরকম পায়ে বল প্রয়োগ করে, স্টেপ ছোট ছোট করে ব্রেক মারতে হয়, সেভাবে থামাচ্ছি। কাঁচের টেবিলে মার্বেল রাখার মতো একটা ধরতে গেলে আরেকটা পালায়। ঘেমে অস্থির। পনেরো মিনিটেও দুল-ওয়ালীর দেখা না পেয়ে তার ট্রলি সাইডে রেখে বের হয়ে আসি।

পার্কিং-এ চিশতীর গাড়ির দড়জায় টোকা দিতেই সে পেছনের ডালা খুলে নির্লিপ্তভাবে কার সাথে যেন ফোনে আলাপ করতে থাকে। আমি নিজেই সব তুলতে থাকি। তার ওপর ভরসা করলে চলবে না। এক নাম্বারের ফাঁকিবাজ। হঠাৎ সে এসে বলল, আমারগুলা কোন সাইডে রাখছিস দেখি?

– বামে

– এইগুলা আমার? জীবনেও এইসব আমার ট্রলিতে তুলি নাই। নন-হালাল টার্কি, মাছ কোই পাইলি? মাছের ঝোলে গাড়ির অবস্থাটা কী করলি বুকা… !

আমি আবার দৌঁড়ে, সিকিউরিটিকে অনুরোধ করে দোকানের ভেতরে ঢুকে বন্ধুর ট্রলি খুঁজতে থাকি। নেই! হন্য হয়ে সেই দুল খুঁজতে থাকি। মানুষের শত শত কান। সবার কান খালি!

আমরা ফিরতে থাকি। সে কিছুক্ষন পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ খুললো, রিপন

– হু

– তিনশো ডলার পানিতে। কোন কাজটা পারিস বলতো? মাথায় যত উল্টাপাল্টা আর উদ্ভট চিন্তা! ভুল তো আর এমনি হয় না! প্রাইম মিনিস্টার আর তোর বয়স না কাছাকাছি?

– ট্রুডো বড়

– আর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট?

– ম্যাকরণ ছোট

– সে কোথায় আর তুই কোথায়?

আমি দাঁতে দাঁত চেপে বসে থাকি।

পথ শেষই হয় না।

হায়রে দুল!

- Advertisement -

Latest Posts

Don't Miss

Stay in touch

To be updated with all the latest news, offers and special announcements.