Latest Posts

মেক্সিকোকে ‘পেছনের দরজা’ বললেন ডগ ফোর্ড, কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির আহ্বান

- Advertisement -
করে ফোর্ড অভিযোগ করেছেন যে, “মেক্সিকো এখন চীনা পণ্যের ট্রান্সশিপমেন্ট হাব বা পেছনের দরজা হয়ে উঠেছে

উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য সম্পর্ক আবারও নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে ঘিরে। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যে বিদ্যমান ইউএসএমসিএ (USMCA) চুক্তি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে ফোর্ড অভিযোগ করেছেন যে, “মেক্সিকো এখন চীনা পণ্যের ট্রান্সশিপমেন্ট হাব বা পেছনের দরজা হয়ে উঠেছে”, যার মাধ্যমে চীনা গাড়ি, যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য পণ্য কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ঢুকছে এবং উত্তর আমেরিকার শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা বিপন্ন করছে।

টরন্টোয় একদল কমিউনিটি সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে ডগ ফোর্ড বলেন, “মেক্সিকো যদি চীনের মতো দেশের পণ্য স্থানান্তরের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারে, তবে তাদের বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে বিশেষ প্রবেশাধিকার থাকা উচিত নয়। আমরা চাই উত্তর আমেরিকার বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা, যাতে আমাদের শ্রমিকরা বিদেশি সস্তা পণ্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।”

- Advertisement -

তার এই বক্তব্য এসেছে এমন এক সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, এবং তিনি ইতিমধ্যেই ইউএসএমসিএ চুক্তি পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া সব বিদেশি পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন এবং “আমেরিকান চাকরি ফিরিয়ে আনা”কে তাঁর অর্থনৈতিক নীতির মূল ভিত্তি করবেন।

ফোর্ডের মতে, উত্তর আমেরিকার বর্তমান বাণিজ্য কাঠামো চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য অপ্রত্যক্ষ সুবিধা তৈরি করছে, যা শেষ পর্যন্ত কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

অন্টারিওর প্রিমিয়ার আরও বলেন, “এখন সময় এসেছে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (Bilateral Free Trade Agreement) নিয়ে আলোচনা শুরু করার। এই ধরনের চুক্তি দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করবে এবং শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে।”

ফোর্ডের এই মন্তব্যে কানাডার ফেডারেল বাণিজ্য মহল কিছুটা বিব্রত অবস্থায় পড়েছে। কারণ, ইউএসএমসিএ হলো ২০২০ সালে কার্যকর হওয়া এক ত্রিপক্ষীয় চুক্তি, যা পুরনো নাফটা (NAFTA)-র পরিবর্তে নতুনভাবে গঠিত হয়। এই চুক্তির আওতায় তিন দেশ প্রায় ২৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজারে একত্রে অংশীদার।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফোর্ডের বক্তব্য একেবারে অমূলক নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনা কোম্পানিগুলো মেক্সিকো হয়ে উত্তর আমেরিকায় প্রবেশ করছে, যেখানে তারা ইউএসএমসিএর সুবিধায় শুল্কমুক্ত রপ্তানি করতে পারছে।

একজন শীর্ষস্থানীয় শিল্প কর্মকর্তা বাংলামেইল-কে বলেন, “চীনা কোম্পানিগুলো মেক্সিকোয় কম খরচে যন্ত্রাংশ তৈরি করে ইউএসএমসিএর সুবিধায় কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছে। এতে তারা কর ছাড় পাচ্ছে, অথচ স্থানীয় উৎপাদকরা সেই সুযোগ পাচ্ছে না। এটি নিঃসন্দেহে এক ধরনের অন্যায্য প্রতিযোগিতা।”

অন্টারিও প্রদেশে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ সরাসরি গাড়ি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্লেষকদের মতে, চীনা যন্ত্রাংশের ক্রমবর্ধমান প্রভাব স্থানীয় উৎপাদনকারীদের প্রতিযোগিতার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কানাডার শিল্পখাতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

অন্যদিকে, মেক্সিকো সরকার তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে জানাচ্ছে যে, তাদের শিল্পনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তারা কোনো দেশের প্রতিযোগিতামূলক ক্ষতি করছে না।

তবে, ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য চাপ এবং কানাডার রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়তে থাকা অসন্তোষের কারণে মেক্সিকো এখন কূটনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর অবস্থানে পড়ছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, যদি কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করে, তাহলে তা ইউএসএমসিএর মতো ত্রিপক্ষীয় কাঠামোকে দুর্বল করে দিতে পারে। এতে উত্তর আমেরিকার যৌথ বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন বিভাজন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক লিন্ডা কার্লসন বলেন, “ফোর্ডের বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এটি কানাডার ফেডারেল সরকারের জন্য কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, কারণ কানাডা এখন পর্যন্ত ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পক্ষেই ছিল।”

ফোর্ডের এই অবস্থান এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কূটনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর “উত্তর আমেরিকা প্রথম (North America First)” ভাবধারা স্পষ্টভাবে কানাডার বাণিজ্য অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ করছে।

তিনি বলেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনায় বসতে চাই। লক্ষ্য একটাই এমন একটি বাণিজ্য কাঠামো তৈরি করা, যা শ্রমিকদের সুরক্ষা দেবে এবং প্রতিটি দেশকে সমানভাবে উপকৃত করবে।”

বাংলামেইলের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ফোর্ডের বক্তব্যে অন্টারিওর উৎপাদন খাতে ইতিবাচক সাড়া পড়েছে। অনেক স্থানীয় উদ্যোক্তা মনে করেন, উত্তর আমেরিকার বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে মেক্সিকোর ভূমিকা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

তবে তারা এটাও মনে করেন, কানাডার উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত করা যাতে ভবিষ্যতে চুক্তি পুনর্গঠন হলেও কানাডার শিল্পখাত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

সব মিলিয়ে ডগ ফোর্ডের সাম্প্রতিক মন্তব্য উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য রাজনীতিতে নতুন তরঙ্গ তুলেছে। মেক্সিকোকে ‘চীনা পণ্যের পেছনের দরজা’ বলে অভিহিত করা নিঃসন্দেহে সাহসী রাজনৈতিক বার্তা, যা কানাডার অর্থনৈতিক কৌশলের নতুন রূপরেখা নির্দেশ করছে।

এখন প্রশ্ন একটাই ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ফোর্ডের সুর মেলানো কানাডার জন্য কতটা লাভজনক হবে, আর ত্রিপাক্ষীয় ইউএসএমসিএ চুক্তি কতটা স্থিতিশীল থাকতে পারবে সেটিই উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য ভবিষ্যতের মূল নির্ধারক হয়ে দাঁড়াবে।

- Advertisement -

Latest Posts

Don't Miss

Stay in touch

To be updated with all the latest news, offers and special announcements.