
গত ১৬ মে কানাডার বাংলাদেশি কমিউনিটির সর্ববৃহৎ ইনডোর ইভেন্ট ‘এবিএ সাপোর্ট সার্ভিসেস প্রেজেন্টস ৯ম বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল’-এর বর্ণাঢ্য আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় টরন্টো প্যাভিলিয়নে। এই আয়োজনটি পাওয়ারড বাই রিয়েলটর আব্দুল আউয়াল, কো-টাইটেল স্পন্সর ব্যারিস্টার সূর্য চক্রবর্তী এবং ইভেন্ট পার্টনার খাজানা বাই খাজানা মিঠাই।
এক যুগের এই পথচলায় কানাডার সর্বাধিক পঠিত বাংলা সংবাদপত্র সাপ্তাহিক বাংলামেইল আয়োজিত বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল সব সময়ই নতুন কিছু উপহার দিয়ে আসছে, যা এ আয়োজনকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এবারের আয়োজনটি উৎসর্গ করা হয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ও তাদের পরিবারগুলোর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা জানিয়ে এবং অটিজম ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত নিবেদিতপ্রাণ মানুষদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে। পাশাপাশি নতুন কিছু সংযোজন অনুষ্ঠানটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
এবারের আয়োজনে আমন্ত্রণ জানানো হয় নতুন প্রজন্মের দুই জনপ্রিয় শিল্পীকে, যারা বিশ্বদরবারে এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে বাংলা গানের প্রচার ও প্রসারে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছেন। তাঁদের একজন মুজা এবং অন্যজন আরজিন কামাল।
ঠিক সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে শুরু হয় নবম বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালের অনুষ্ঠান। হলভর্তি দর্শকদের উপস্থিতিতে দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সূচনা হয় আয়োজনের। ৯ম বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলে মঞ্চে উপস্থিত হয়ে কানাডা ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান।
ল্যান্ড অ্যাকনলেজমেন্ট পাঠ করেন নির্জলা প্রিয়দর্শিনী। এ আয়োজন উপলক্ষে মূলধারার বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্টজনেরা শুভেচ্ছাবার্তা প্রদান করেন। কেউ উপস্থিত থেকে শুভেচ্ছা জানান, আবার কেউ পাঠান লিখিত বা ভিডিও শুভেচ্ছাবার্তা। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির পাঠানো শুভেচ্ছাবার্তাটি পাঠ করেন যাহরা চৌধুরী। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডের ভিডিও শুভেচ্ছাবার্তা প্রদর্শন করা হয় পর্দায়।
এরপর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের জন্য মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানো হয় এমডি শাহ আলম খোকন (কনসাল জেনারেল অব বাংলাদেশ, টরন্টো), শহিদুল ইসলাম মিন্টু (বাংলামেইল সম্পাদক, এনআরবি টিভির সিইও এবং বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালের প্রতিষ্ঠাতা কনভেনর), কাজী আলম বাবু (সাপ্তাহিক বাংলামেইলের নির্বাহী সম্পাদক), স্বপ্না দাশ (বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর), তাসমিনা খান (এবিএ সাপোর্ট সার্ভিসেসের সিইও ও প্রথম বাংলাদেশি বিসিবিএ), আব্দুল আউয়াল (বিশিষ্ট রিয়েলটর ও টরন্টো হোম বিল্ডার্সের সিইও), ব্যারিস্টার সূর্য চক্রবর্তী (সুরিয়া ল প্রফেশনাল করপোরেশনের কর্ণধার), খোকন আব্বাস (বিশিষ্ট সংগঠক ও খাজানা বাই খাজানা মিঠাইয়ের পক্ষে), মোর্শেদ নিজাম (সিপিএ, রাজনীতিক ও বিশিষ্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট), ব্যারিস্টার ওমর হাসান আল জাহিদ, তানজিম সোহাগ (স্পাইসি গ্রিলের কর্ণধার), ব্যারিস্টার জাকির হোসেন সরকার, মুসতাক চৌধুরী (মর্টগেজ এজেন্ট), এজাজ আকতার তৌফিক (বাংলাদেশ সোসাইটি অব মন্ট্রিয়লের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট), জিয়াউল হক জিয়া (কানাডা-বাংলাদেশ সলিডারিটির প্রেসিডেন্ট), ডা. নুরুল্লাহ তরুণ (বিশিষ্ট রাজনীতিক ও সমাজসেবী), আলমগীর রহমান (বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার অব কানাডার প্রেসিডেন্ট), আকমল সরকার (বিশিষ্ট রিয়েলটর), আব্দুল মান্নান (বিশিষ্ট রিয়েলটর), আনিকা চৌধুরী (এসি প্রপার্টিজের সিইও), ইকবাল রুশদ (টিম হর্টনস পার্টনার ও ওনার), আব্দুল হালিম মিয়া (এনআরবি টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক) এবং ব্যারিস্টার কামরুল হাফিজ আহমেদ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফোরামের সাবেক সভাপতি)-কে।
কনসাল জেনারেল এমডি শাহ আলম খোকনের উদ্বোধনী বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হয় নবম বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। পরে মঞ্চে উপস্থিত অতিথিরা সংক্ষিপ্ত বক্তব্য প্রদান করেন।
সাংস্কৃতিক আয়োজনের শুরুতেই নৃত্যকলা কেন্দ্রের দৃষ্টিনন্দন নৃত্য পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। গুরু বিপ্লব কর, গুরু মা দীপশিখা কর এবং বিভিন্ন বয়সের ক্ষুদে ও তরুণ নৃত্যশিল্পীদের পরিবেশনায় দর্শক যেন ফিরে যায় বাংলা মায়ের কোলে।
বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল প্রতি বছর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা জানিয়ে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার সম্মান জানানো হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আইভেন ডি রোজারিওকে। ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ গানটির সঙ্গে উপস্থিত দর্শক দাঁড়িয়ে সম্মান জানান এই সাহসী মুক্তিযোদ্ধাকে।
এরপর টরন্টোর গুণী সংগীতশিল্পীরা মঞ্চে সুরের ধারা ছড়িয়ে দেন দর্শকদের হৃদয়ে। সংগীত পরিবেশন করেন মাসুদ আহমেদ, টিটো আহমেদ, এমরান হোসেন সুমন, ফারহানা লিমা, তাসমিনা খান ও শমিত বড়ুয়া।
প্রতি আয়োজনে বিশেষ অবদানের জন্য এনআরবি অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। এ বছর সংগীত শাখায় শমিত বড়ুয়াকে এই অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে সম্মানিত করা হয়।
নৃত্য পরিবেশনায় আরও ছিলেন গুণী নৃত্যশিল্পী নাহিদ নাসরিন নয়ন এবং গুরু চিত্র দাস ও চারুশি সেনের যুগল নৃত্য।
এ বছর প্রথমবারের মতো যাত্রা শুরু করে ‘বাংলামেইল–কবি ইকবাল হাসান সাহিত্য পুরস্কার ২০২৬’। এ পুরস্কারের জন্য ২০২৬ সালে নির্বাচিত হয়েছেন কানাডার ভ্যাঙ্কুভার নিবাসী কবি, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও সম্পাদক শাহানা আকতার মহুয়া।
প্রথমবারের মতো পুরস্কার বিজয়ী নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা জুরি বোর্ডে ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী, লেখক ও সাপ্তাহিক বাংলামেইলের সম্পাদকীয় উপদেষ্টা সৈয়দ ইকবাল, বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক সুব্রত কুমার দাস, কবি ও সংগঠক দেলওয়ার এলাহী, কথাসাহিত্যিক তসলিমা হাসান এবং বাংলামেইলের সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিন্টু।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ ইকবাল, সুব্রত কুমার দাস, দেলওয়ার এলাহী, তসলিমা হাসান এবং শহিদুল ইসলাম মিন্টু। এক হাজার ডলারের চেক ও সম্মাননা প্রদান করেন পয়েট লরিয়েট লিলিয়ান অ্যালেন।
টরন্টোর গুণী শিল্পীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে নৃত্যকলা কেন্দ্রের আরও একটি অনবদ্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। এ সময় সম্মানিত পৃষ্ঠপোষকদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
আয়োজনে বরাবরের মতো মূলধারার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সম্মানিত এমপি, এমপিপি, কাউন্সিলর এবং টরন্টোর মেয়র উপস্থিত হয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অলিভিয়া চাও (মেয়র, টরন্টো), ন্যাথানিয়েল আরস্কিন-স্মিথ (এমপি), সালমা জাহিদ (এমপি), ডলি বেগম (এমপিপি), মারিত স্টাইলস (এমপিপি ও লিডার অব দ্য অফিসিয়াল অপোজিশন), আন্দ্রেয়া হ্যাজেল (এমপিপি), ডেভিড স্মিথ (এমপিপি), ওং ট্যাম (এমপিপি), ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড (টরন্টো সিটি কাউন্সিলর) এবং পার্থি কান্দাভেল (টরন্টো সিটি কাউন্সিলর)। শুভেচ্ছা বক্তব্য শেষে তাঁরা আয়োজনের সম্মানিত স্পন্সরদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন।
অতিথি শিল্পীদের পরিবেশনার আগে আন্তর্জাতিক ধারাভাষ্যকার মাসুদ করিমের হাস্যরসাত্মক কথোপকথন দর্শকদের জন্য ছিল বিশেষ আকর্ষণ।
অতিথি শিল্পীদের মধ্যে প্রথমেই মঞ্চে আসেন জনপ্রিয় সংগীত তারকা আরজিন কামাল। সংগীতের কোনো ভাষা নেই—এই সত্যকে ধারণ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং কানাডার বিভিন্ন শহরে বাংলা গানকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার ও সংগীতশিল্পী। বাংলাদেশে তিনি একাধিক চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন।
তার গায়কীর যাদুতে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়েন টরন্টো প্যাভিলিয়নের দর্শকরা। তাঁর মৌলিক গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলান উপস্থিত শ্রোতারা, সুরের ছন্দে নেচে ওঠেন, আবার কখনো হারিয়ে যান সংগীতের আবেশে। টানা এক ঘণ্টার পরিবেশনায় তিনি মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেন দর্শকদের মাঝে।
এরপর মঞ্চে আসেন তরুণ প্রজন্মের ক্রেজ মুজা। বাংলা পুরোনো গান নিয়ে গবেষণাধর্মী ও ব্যতিক্রমধর্মী কাজের মাধ্যমে তিনি ইতোমধ্যেই ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে নিউইয়র্কে পাড়ি জমালেও বাংলা ভাষা ও বাংলা গানের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনো কমেনি। বাংলা গানকে নতুন অঙ্গিকে উপস্থাপন করে বাংলাদেশ ও প্রবাসে তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।
মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি ভক্ত-শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে। সবাই পরিচিত গানের সুরে কণ্ঠ মেলাতে থাকেন। সিলেটি আঞ্চলিক গান ও আধুনিক সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে তিনি জয় করে নেন শ্রোতাদের হৃদয়। আয়োজনের পক্ষ থেকে এই দুই অতিথি শিল্পীকে ক্রেস্ট প্রদান করে সম্মান জানানো হয়।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন টরন্টোর দুই পরিচিত মুখ মাহবুব ওসমানী ও অজন্তা চৌধুরী। স্থিরচিত্র গ্রহণে ছিলেন শহরের সুপরিচিত আলোকচিত্রী দীপক সূত্রধর, জিসান সুলতানা ও কাজী সারোয়ার। শব্দব্যবস্থার দায়িত্বে ছিল ডানফোর্থ সাউন্ড এবং প্রজেক্টর ডিসপ্লেতে ছিলেন রিজভী আহমেদ রিজ। পুরো সাংস্কৃতিক আয়োজন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন স্বপ্না দাশ।
এভাবেই সমাপ্তি ঘটে ৯ম বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালের বর্ণাঢ্য আয়োজনের। টরন্টোর সিগনেচার সর্ববৃহৎ ইনডোর ইভেন্টটি আবারও উপস্থিত সবার ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। টরন্টোবাসীর আস্থা, বিশ্বাস ও অকৃত্রিম ভালোবাসায় বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল আবারও প্রমাণ করেছে, এটি কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি মহা মিলনমেলা।
আগামী বছর অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালের ১০ম আসর। দশ বছরে পদার্পণ করতে যাওয়া এ আয়োজনকে আরও সমৃদ্ধ ও ব্যতিক্রমীভাবে উপস্থাপনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। খুব শিগগিরই ঘোষণা করা হবে আগামী আয়োজনের তারিখ, স্থান এবং শিল্পীদের নাম।

