
যেন প্রকৃতিও অপেক্ষা করছিল প্রবীণদের এক আনন্দোৎসবের সাক্ষী হতে। পাঁচই জুলাই, রোববার সকালে টরন্টোর নান্দনিক ব্লাফার্স পার্ক নতুন রূপে সেজে উঠেছিল। প্রখর গ্রীষ্মের সূর্য যেন তার তাপ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল। সারাদিন আকাশে মেঘের আনাগোনা থাকলেও বৃষ্টি নামেনি। শান্ত ওন্টারিও লেকের নীল জলরাশি, শীতল বাতাস আর সবুজ প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝেই অনুষ্ঠিত হলো বেঙ্গলি ইনফরমেশন অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস (BIES) আয়োজিত প্রবীণদের গ্রীষ্মকালীন পিকনিক।
শুধু একটি পিকনিক নয়, এটি ছিল প্রবীণদের জন্য ভালোবাসা, সম্মান ও একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এক অনন্য আয়োজন। ৬২ জন প্রবীণের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে ব্লাফার্স পার্ক যেন পরিণত হয়েছিল এক টুকরো বাংলাদেশে।
অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ ভিক্টোরিয়া পার্ক স্টেশন থেকে গণপরিবহনের মাধ্যমে ব্লাফার্স পার্কে পৌঁছান। পুরো যাত্রার সমন্বয় করেন BIES এবং কানাডিয়ান সেন্টারের কর্মীরা। এছাড়া অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা হুইল-ট্রান্স সেবার মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল আন্তরিকতা, প্রাণচাঞ্চল্য এবং পারিবারিক উষ্ণতার আবহ।
পিকনিকের শুরু থেকেই ছিল উৎসবের আমেজ। কেউ পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছেন, কেউ আবার দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়া পরিচিতজনকে জড়িয়ে ধরে কুশল বিনিময় করেছেন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল হাসি আর আনন্দের রেশ।
সাংস্কৃতিক আয়োজন ছিল এ দিনের অন্যতম আকর্ষণ। বাংলা গানের সুরে মুখর হয়ে ওঠে পুরো পার্ক। প্রবীণরা গান গেয়েছেন, নেচেছেন, অংশ নিয়েছেন ক্যারাওকে পরিবেশনায়। দলীয় প্রতিযোগিতা ও মজার খেলায় অংশ নিয়ে তারা যেন আবার ফিরে গিয়েছিলেন তারুণ্যের দিনগুলোতে। আনন্দঘন এই পরিবেশ দেখে পার্কে বেড়াতে আসা অন্য দর্শনার্থীরাও আকৃষ্ট হন এবং অনেকেই গান ও নাচ উপভোগ করতে অংশ নেন।
খাবারের আয়োজনেও ছিল আন্তরিকতার ছোঁয়া। অতিথিদের স্বাগত জানানো হয় গরম শিঙাড়া ও চা দিয়ে। মধ্যাহ্নভোজে পরিবেশন করা হয় সুস্বাদু পোলাও, রোস্ট এবং মিষ্টান্ন হিসেবে ছিল সবার প্রিয় গুলাব জামুন। সুস্বাদু খাবারের সঙ্গে প্রাণখোলা আড্ডা পুরো আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
মধ্যাহ্নভোজের পর শুরু হয় আরও উৎসবমুখর পর্ব। বাংলা গানের ক্যারাওকে পরিবেশনায় প্রবীণরা নিজেদের প্রতিভার পরিচয় দেন। BIES-এর কর্মীরা আয়োজন করেন জনপ্রিয় ‘বালিশ-পাসিং’ (Pillow Passing) প্রতিযোগিতা, যেখানে প্রথম তিনজন বিজয়ীকে নগদ পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরুষদের জন্যও ছিল আলাদা মজার প্রতিযোগিতা, যা উপস্থিত সবাইকে আনন্দে ভরিয়ে তোলে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে BIES-এর নির্বাহী পরিচালক ইমাম উদ্দিন বলেন, “আমাদের কমিউনিটির প্রবীণদের জন্য বছরে অন্তত একটি দিন আনন্দ, মিলন এবং সম্মানের পরিবেশ তৈরি করতে পারা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। তাদের হাসিমুখই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
BIES-এর প্রোগ্রাম অ্যান্ড সার্ভিসেস ডিরেক্টর গোলাম মোস্তফা অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানান। এছাড়া প্রবীণদের পক্ষ থেকে এনামুল হক, মাজহারুল হক, রীনা সেন গুপ্তা এবং রাহাত জামান সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে এমন আয়োজন নিয়মিত চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
দিনের শেষ বিকেলে যখন সবাই ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন কারও চোখেমুখে ছিল না বিদায়ের বিষণ্নতা; বরং ছিল পরবর্তী মিলনমেলার অপেক্ষা। হাসি, গান, নাচ, বন্ধুত্ব, আন্তরিকতা আর অসংখ্য স্মৃতিতে ভরা এই দিনটি অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের হৃদয়ে দীর্ঘদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে বলে মনে করেন অংশগ্রহণকারীরা।

