Latest Posts

অনন্য এক সাহিত্যিক আয়োজন

- Advertisement -
গত ১লা মে এক অনন্য সাহিত্যিক আবহে অনুষ্ঠিত হলো বহুল প্রতীক্ষিত গ্রন্থ “কানাডায় একাত্তর বাঙালির অভিজ্ঞতা”-এর বর্ণাঢ্য প্রকাশনা উৎস

টরন্টোর স্কারবরোর প্রাণকেন্দ্রে গত ১লা মে এক অনন্য সাহিত্যিক আবহে অনুষ্ঠিত হলো বহুল প্রতীক্ষিত গ্রন্থ “কানাডায় একাত্তর বাঙালির অভিজ্ঞতা”-এর বর্ণাঢ্য প্রকাশনা উৎসব। প্রবাসী বাঙালিদের ইতিহাস, স্মৃতি, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের বহুমাত্রিক দলিল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা এই সংকলনটি সম্পাদনা করেছেন সুব্রত কুমার দাস। টরন্টোর সেইন্ট পল ইউনাইটেড চার্চে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি শুধু একটি বই উন্মোচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা পরিণত হয়েছিল এক আবেগঘন, প্রাণবন্ত এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ মিলনমেলায়, যেখানে সাহিত্য ও প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা একসূত্রে গাঁথা হয়ে ওঠে। এই আয়োজনে শুধু একটি বই নয়, আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য প্রকাশনাও উন্মোচিত হয়। কলকাতা থেকে প্রকাশিত কবি শ্যামশ্রী রায় কর্মকার সম্পাদিত সাহিত্য সাময়িকী “সাহিত্য এখন” এবং লন্ডন থেকে প্রকাশিত কবি উদয় শংকর দুর্জয় সম্পাদিত “Poetry Out Loud”-এর কানাডা বিষয়ক বিশেষ সংখ্যাও এই মঞ্চে উপস্থাপন করা হয়। ফলে অনুষ্ঠানটি একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য সংযোগের ক্ষেত্র হিসেবে রূপ নেয়।

সন্ধ্যা ছয়টা থেকে শুরু হয় অতিথিদের আগমন। প্রবেশদ্বারেই প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয় ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পিঠা এবং অন্যান্য সামগ্রী। ধীরে ধীরে হলভর্তি হয়ে ওঠে নানা প্রজন্মের সাহিত্যপ্রেমী, লেখক, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে। কেউ পুরনো পরিচিতদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেন, কেউ আবার আগ্রহভরে নতুন প্রকাশিত বইটি হাতে নিয়ে পাতা উল্টে দেখতে শুরু করেন। পুরো পরিবেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক ধরনের প্রত্যাশা, উচ্ছ্বাস ও আবেগের মিশ্র অনুভূতি।

- Advertisement -

সন্ধ্যা ঠিক সাতটায় শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। কানাডা জার্নালের উদ্যোগে প্রকাশিত ৫৬০ পৃষ্ঠার এই সংকলনটি প্রবাসী বাঙালিদের অভিজ্ঞতার এক বিশাল ভাণ্ডার। একাত্তর অভিবাসীর স্মৃতি, দেশত্যাগের বেদনা, অভিবাসনের সংগ্রাম, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার নিরন্তর প্রচেষ্টা – সবকিছুই এই বইয়ের পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন, এটি কেবল একটি সাহিত্যকর্ম নয়; বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ড. ইখতিয়ার ওমর তাঁর বক্তব্যে বইটির তাৎপর্য গভীরভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রবাসে বসবাসরত মানুষের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাকে লিপিবদ্ধ করার এই উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু ইতিহাস সংরক্ষণ নয়, বরং নতুন প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাঁর বক্তব্যে ছিল দায়বদ্ধতা, আবেগ এবং ভবিষ্যতের প্রতি দৃঢ় প্রত্যাশার প্রতিফলন।

অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিলেন টরন্টোর খ্যাতিমান কবি জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক, অ্যান মাইকেলস এবং এ. এফ. মরিৎজ এবং লিলিয়ান অ্যালেন। তাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানে এক আন্তর্জাতিক মাত্রা যোগ করে। তাঁরা তাঁদের বক্তব্যে সাহিত্যের শক্তি, স্মৃতির গুরুত্ব এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজে অভিবাসীদের অবদানের কথা তুলে ধরেন। টরন্টোর বর্তমান পোয়েট লরিয়েট লিলিয়ান অ্যালেন তাঁর স্বতন্ত্র উপস্থাপনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেন, যা দর্শকদের গভীরভাবে মুগ্ধ করে।

সুব্রত তাঁর উদ্বোধনী বক্তৃতায় এই প্রকাশনা উৎসবের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি আরও জানান, বাংলা মেইল এ বছর চারজন পোয়েট লরিয়েটকে নিয়ে তাদের জন্মদিন উপলক্ষ্যে বিশেষ সাপ্লিমেন্ট প্রকাশ করেছে। সেগুলো প্রকাশের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেন কানাডা জার্নালের উদ্যোক্তা সুব্রত কুমার দাস। এরপর বাংলামেইলের সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মিন্টু সেই সাপ্লিমেন্টগুলোর রেপ্লিকা কবিদের হাতে তুলে দেন। সাপ্লিমেন্টগুলো উক্ত চার পোয়েট লরিয়েটকে যার পর নাই উচ্ছ্বসিত করে তোলে এবং পরমুহূর্তেই তাঁদের বক্তব্যে তা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অনুষ্ঠানের শুরু হয় আরিয়ানা ইসলামের ল্যান্ড একনলেজমেন্ট পাঠের মধ্য দিয়ে। এরপর মঞ্চে আহবান করা হয় উপস্থিত মূলধারার কবিদের; যাঁদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিয়াত্রিজ হাউসনার, আন্না ইয়িন এবং প্যাট্রিক কনোরসকে। প্রধান অতিথির সাথে তাদেরকে ফুলের তোড়া দিয়ে স্বাগত জানান ড. দিলীপ চক্রবর্তী। এরপর মঞ্চে আহবান করা হয় দূরদূরান্তের বিভিন্ন শহর থেকে আগত বাংলাদেশি আরও কতক লেখকদের; তাঁরা পোয়েট লরিয়েটদের কাছ থেকে ফুলের তোড়া গ্রহণ করেন। মিডিয়া পার্টনার শহিদুল ইসলাম মিন্টুর বক্তব্যের পর সঞ্চালিকা এবং লেখক তাসমিনা খান এবং মাহবুব ওসমানী অনুষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক সঞ্চালনা শুরু করেন।

এই প্রকাশনা আয়োজনে আর্থিক সহায়তা প্রদানকারী ব্যক্তিদের প্রতিও অনুষ্ঠানে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মনীষ পাল, ব্যারিস্টার সূর্য চক্রবর্তী, সিপিএ মোর্শেদ নিজাম এবং মর্টগেজ এজেন্ট ইঞ্জিনিয়ার বজলুর মারুফ – তাঁদের সহযোগিতা ছাড়া এমন একটি বৃহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো না। একই সঙ্গে শিল্পী মোস্তাফিজ কারিগরের দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ বইটিকে নান্দনিক এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

অনুষ্ঠানে সহযোগী হিসেবে NRB Television এবং সাপ্তাহিক বাংলামেইল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের মিডিয়া সাপোর্টের মাধ্যমে এই আয়োজনটি বৃহত্তর প্রবাসী বাঙালি সমাজে পৌঁছে যায় এবং ব্যাপক সাড়া ফেলে।
তিন সংকলনের বহু লেখক এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং সম্মানিত অতিথিদের কাছ থেকে নিজেদের লেখক কপি গ্রহণ করেন। সেই মুহূর্তগুলো ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। কারও চোখে আনন্দাশ্রু, কারও মুখে দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণের তৃপ্তি – এই দৃশ্যগুলো অনুষ্ঠানটিকে এক মানবিক গভীরতা দেয়, যা একটি সাধারণ বই প্রকাশনার গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়।
বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বারবার উল্লেখ করেন, “কানাডায় একাত্তর বাঙালির অভিজ্ঞতা” শুধুমাত্র অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, বরং এটি একটি চলমান যাত্রার প্রতিচ্ছবি। প্রবাসে থেকেও কীভাবে বাঙালিরা তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে ধারণ করে রেখেছে – এই গ্রন্থ তারই এক উজ্জ্বল প্রমাণ। এটি নতুন প্রজন্মকে তাদের পরিচয় সম্পর্কে সচেতন করবে এবং তাদের মধ্যে আত্মগৌরবের বোধ জাগ্রত করবে।

উল্লেখযোগ্য যে, বইটি ঢাকার রয়েল পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং ইতোমধ্যেই পাঠকমহলে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। গবেষণা, সাহিত্যচর্চা এবং প্রবাসী ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী পাঠকদের জন্য এটি একটি মূল্যবান সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সবশেষে আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, এই ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে এবং প্রবাসী বাঙালিদের ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতিকে আরও সুসংহতভাবে লিপিবদ্ধ করার পথ তৈরি করবে।

সার্বিকভাবে, এই প্রকাশনা উৎসবটি ছিল এক স্মরণীয় সন্ধ্যা – যেখানে সাহিত্য, ইতিহাস, আবেগ এবং কমিউনিটির বন্ধন একত্রে মিলে তৈরি করেছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা, যা দীর্ঘদিন ধরে উপস্থিত সকলের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে।

- Advertisement -

Latest Posts

Don't Miss

Stay in touch

To be updated with all the latest news, offers and special announcements.