
‘আমি যেন ঐ আলোর খেয়া, আনমনে ভেসে যাই, কোন স্বপ্নের দেশে যাই…..’ আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্যারের লেখা ও মহামতি আব্দুল আহাদের সুরে রুনা লায়লার কণ্ঠে অসাধারণ সেই- অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে, যেন এক মুঠো রোদ্দুর আমার দু’চোখ ভরে, তুমি এলে… গানটির সঞ্চারীর এই কথাগুলো আমার হৃদয় উৎসারিত হয়ে থেকে থেকে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কোথায়, কোন সুদূরে আমি জানি না। শুধু জানি আমি ভেসে যাচ্ছি। আমি উড়ে যাচ্ছি৷ কোন অমরাবতীর পাখনায় ভর করে ভেসে ভেসে গ্রহ নক্ষত্র পার হয়ে আমি চলে যাচ্ছি শূন্য মহাসাগরের গভীর উচ্চ শৃঙ্গে। বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ এসে আমাকে ঝাপটে ধরে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে স্বর্গীয় সুরের অদৃশ্য ডানা! যতোই উপরে যাই নীল, যতোই গভীরে যাই সুরের মধু পান করে করে আমি নীলকণ্ঠ পাখির মতো আমাকেই ঝাপটে ধরি দৈবাৎ!
এমন যে হয়, এমন যে হতে পারে, কে জানতো! আমি জানি না, আমি বুঝি না, কোন সুদূরের ধ্বনি উৎসমুখ থেকে ধেয়ে আসা ক্রমসম্প্রসরমাণ এক মহাসিন্ধুর ঢেউ এসে আমাকে উত্তাল তরঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে যায়! আমি দোলে উঠি, কেঁপে উঠি, নিজেকে বিলীন করে বারংবার নিজের কাছেই লীন হয়ে থাকি! আমার মন অকারণ হেসে ওঠে। অকারণ অপরাধে আমি কেঁপে কেঁপে ওঠি! আমি জানি আমার মুক্তি নাই, আমার মুক্তি নাই, আমার মুক্তি নাই আত্মদহনের স্বয়ংম্পুরা অগ্নির কাছে!

চারপাশের অবিশ্রান্ত কোলাহলে আমি যখন সম্পূর্ণ একা, আমার সহসা মনে হয় – আছে! আর আছে বলেই কি আমার দেহের মাঝে এতো বেশী দেহক্ষয়! সে কি তবে আছে আমারই আত্মার কাছাকাছি! কোন পরশপাথরের আয়নায় দেখা যায়, এই না বলা অনুভবের ঢেউ!

সপ্তস্বরের সুরের উপাসনালয়েই কি তবে বিরাজ করে মহামহিমের অদৃশ্য অপরূপ রূপ! পৃথিবীতে নেমে আসা সেই রূপের স্বর্গীয় মুহূর্তকণার মাধুরিতে সবাই একই আলোর খেয়ায় তন্ময় হয়ে থাকেন! নির্বাক হয়ে মুগ্ধ বিস্ময়ে আকণ্ঠ পান করেন সুরের মাতাল করা সুধা! কোন সুদূরের শূন্যতার আকাশে উড়ে উড়ে যাওয়া পাখিটি মহাজাগতিক অনুভবের সুরের ডাকে চুপি চুপি উপস্থিত হয় আমার আত্মার আরশিতে। এমন যে হয়, এমন যে হতে পারে, কে জানতো!

২.
মামুন জাহিদ। শিল্পী। কণ্ঠশিল্পী। একজন শ্রোতার কাছে এটুকু বললেই মামুনের পরিচয় ধরা পড়ে। কিন্তু কিছু কিছু শ্রোতার কাছে এই পরিচয়ের বাইরেও তার নামের সাথে জড়িয়ে থাকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উজ্জ্বল ভাস্বর কিছু স্মরণীয় মুখের প্রতিচ্ছবি। অভিনয় শিল্পী খালেদ খান যুবরাজ, শিল্পী মিতা হক, এই শিল্পীদ্বয়ের কন্যা জয়ীতা প্রমুখ মামুন জাহিদকে ঘিরে জড়িয়ে থাকেন তাঁরাও! নন্দিত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী কাকলির উপরে উল্লেখিত নামের মানুষের আত্মার সম্পর্ক। সেই আত্মার আত্মীয় শিল্পী মামুন জাহিদ এই শহরে আসা উপলক্ষে নাহিদ কবির কাকলি আয়োজন করলেন তার বাড়িতে এক ঘরোয়া গানের আসর। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের রাতে এই আয়োজন বলে স্বভাবতই দেশাত্মবোধকের সাথে আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানের সাজানো ডালিই মামুন মেলে ধরলেন শ্রোতাদের উৎকীর্ণ কানের কুহরে৷

জানি বাংলাদেশ থেকে আসলে মূলধারার শিল্পীদের আশানুরূপ প্রেরণায় কিছুটা হলেও উৎসাহের পারদ চূড়া স্পর্শ করে না হয়তো। কিন্তু টরন্টোর ক্ষেত্রটা ভিন্ন। আমাদের সঙ্গীতাঙ্গন যে কতটা সমৃদ্ধ অন্তত, এবং আমরা যে কত সৌভাগ্যবান, তা পরখ করার পরিমাপক বোধই হয়তো আমাদের নেই। ভাবা যায়, ওস্তাদ মুনশি রইসুদ্দিনের দুই প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ সন্তান আমাদের শহরেই বসবাস করেন। জাহিদ হোসেন ও রূপতনু শর্মা তো বাংলাদেশের মূলধারার গানের ভুবনে অনিবার্য দুটো নাম। জাহিদ হোসেন, রূপতনু শর্মাকে সহসঙ্গতে পেয়ে স্বয়ং সাবিনা ইয়াসমিন যখন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে সৌভাগ্যের কথা বলেন, তখনও আমাদের যথাযথ উপলব্ধি হয়তো হয় না, আমাদের দেশের জাতীয় গৌরবময় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কত কত মহামতি রত্নের মতো সৃষ্টিশীল গুণী মানুষ আমাদের এই শহরে বসবাস করেন।

দেশখ্যাত প্রখ্যাত কীবোর্ড শিল্পী রূপতনু শর্মাকে পেয়ে মামুন তাঁদের অনেক যুগল কাজের স্মৃতিচারণার সঙ্গে সঙ্গে শ্রদ্ধা-সম্মানের মিশিলে এও বললেন – বাংলাদেশে রূপতনু শর্মার বিকল্প নেই। তাঁর ঐ জায়গাটা আর পূরণ হবার নয়। অন্তত এখনো হয়নি। তাঁরা পরস্পরকে পেয়ে আনন্দের সাম্পানে যে সুরের ভুবনে আমাদেরকে নিয়ে গেলেন তার সাক্ষী কাকলির বাসায় উপস্থিত মুগ্ধ শ্রোতাবৃন্দ৷ শ্যামল গুপ্ত, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, খান আতাউর রহমান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জাহিদুল হক, রফিকউজ্জামান, আমজাদ হোসেন প্রখুখের লেখা, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, আব্দুল আহাদ, শৈলেন মুখোপাধ্যায়, ভি, বালসারা, খোন্দকার নূরুল আলম, আমির আলী, বাপ্পি লাহিড়ী, শেখ সাদী খান প্রমুখের সুর করা গান পরিবেশন করে শোনালেন মামুন জাহিদ। রূপতনু শর্মার হৃদয় ছোঁয়া কীবোর্ডের উন্মাতাল সঙ্গত, সজল রায়ের তবলার বোলের সাথে সাথে মামুন অন্য এক জগতে ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন আমাদের সবাইকে। মামুন নিজেও সুরের জাদুর ছোঁয়ায় প্রিয় মুখের অবিচ্ছেদ্য স্মৃতির প্রহারে অশ্রু সংবরণ করে নির্বাক শ্রোতাদেরকে প্রভাবিত করেছেন মায়ার মোহন নীরবতায়। উদ্বেলিত উপস্থিতি পিনপতনকে আরাধ্য করেছেন।

এরকম একটি অসামান্য রাতে গানের ভেলায় ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে শিল্পীদের প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা। কাকলিকে অসংখ্য ধন্যবাদ এরকম এক আয়োজনে আমাকে নিমন্ত্রণ করার জন্য।

নাহিদ কবির কাকলি, মামুন জাহিদ, রূপতনু শর্মা, সজল রায়, ক্যারি ক্রিস্টোফার রোজারিও, আমি ধন্য, আমি ধন্য!
ভালোবাসা অবিরাম!

টরন্টো, কানাডা

