
কানাডার অন্টারিও প্রদেশে শিক্ষা প্রশাসন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রদেশের শিক্ষামন্ত্রী পল ক্যালান্দ্রা সম্প্রতি আরও দুইটি স্কুল বোর্ডকে সরাসরি প্রাদেশিক পর্যবেক্ষণের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ইয়র্ক ক্যাথলিক স্কুল বোর্ড এবং পিল ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যবেক্ষণে নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে বোর্ডগুলোর ভেতরে চলমান দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ। প্রদেশ মনে করছে, এসব সমস্যার কারণে শিক্ষা প্রশাসন এবং শিক্ষার্থীদের সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
গত এক বছরে অন্টারিও সরকার ইতোমধ্যে আরও ছয়টি স্কুল বোর্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে টরন্টো, অটোয়া এবং লন্ডন শহরের কয়েকটি পাবলিক ও ক্যাথলিক স্কুল বোর্ড। ফলে নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মোট আটটি বোর্ড এখন প্রাদেশিক তত্ত্বাবধানে চলে গেল। শিক্ষামন্ত্রণালয় বলছে, এসব ক্ষেত্রে লক্ষ্য হলো বোর্ডগুলোর আর্থিক শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা। প্রদেশের কর্মকর্তারা মনে করছেন, কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোর্ডগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে।
সম্প্রতি অন্টারিও সরকার একটি নতুন আইন পাস করেছে, যার ফলে শিক্ষামন্ত্রী স্কুল বোর্ডগুলোর ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আরোপের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষমতা পেয়েছেন। এই আইনটি মূলত কয়েকটি বিতর্কিত আর্থিক ব্যয়ের ঘটনার পর সামনে আসে। উদাহরণ হিসেবে একটি স্কুল বোর্ড প্রায় ৪০ হাজার ডলার ব্যয়ে টরন্টোতে একটি প্রশাসনিক রিট্রিট আয়োজনের অনুমোদন দেয়, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, এক লাখ ডলারেরও বেশি খরচ করে শিল্পকর্ম কেনার উদ্দেশ্যে ইতালি সফর করা হয়েছে। এই ধরনের ব্যয়কে অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয় বলে আখ্যা দিয়ে প্রদেশ বোর্ডগুলোর আর্থিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কঠোর অবস্থান নেয়। আরও কয়েকটি বোর্ড তাদের বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে মন্ত্রীর সমালোচনার মুখে পড়ে।
গত কয়েক মাস ধরেই শিক্ষামন্ত্রী পল ক্যালান্দ্রা স্কুল বোর্ডের ট্রাস্টিদের ক্ষমতা বাতিল করার সম্ভাবনার কথা ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এই পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনাও কম নয়। সমালোচকদের দাবি, প্রাদেশিক সরকারের এই সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে। তাদের মতে, বেশিরভাগ বোর্ডের আর্থিক সংকটের মূল কারণ হলো প্রদেশের দীর্ঘদিনের স্বল্প তহবিল বরাদ্দ। পর্যাপ্ত অর্থ না দিয়েই বোর্ডগুলোর ওপর দায় চাপানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
স্কুল বোর্ড পরিচালনায় ট্রাস্টিরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা মূলত স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধি, যারা বোর্ডের নীতিনির্ধারণ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্মিলিতভাবে কাজ করেন। কিছু অঞ্চলে তাদের পর্ষদ সদস্য বা কমিশনার হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। ট্রাস্টিদের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে – স্কুল বোর্ডের বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন ও পরিচালনা, শিক্ষা নীতিমালা নির্ধারণ, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনা, ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগ। একজন ট্রাস্টি হতে হলে তাকে অবশ্যই ১৮ বছরের বেশি বয়সী কানাডিয়ান নাগরিক হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট স্কুল বোর্ডের সীমানার মধ্যে বসবাস করতে হবে। তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য সম্মানী প্রদান করা হয়, তবে এই অর্থের পরিমাণ অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে।
অন্টারিওতে স্কুল বোর্ডগুলোর ওপর প্রাদেশিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ার ফলে শিক্ষা প্রশাসনের কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার বলছে, তারা আর্থিক শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা, এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ কমে যেতে পারে এবং নির্বাচিত ট্রাস্টিদের ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

