
মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকা নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে কানাডা সরকার তাদের নাগরিকদের জন্য কঠোর সতর্কতা জারি করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা (জিএসি) মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১০টি দেশে সব ধরনের ভ্রমণ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, বর্তমানে এই অঞ্চলে প্রায় ৮৫ হাজারের বেশি কানাডিয়ান নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দা অবস্থান করছেন বলে নিবন্ধিত তথ্য পাওয়া গেছে। ক্রমবর্ধমান সংঘাত ও প্রতিশোধমূলক হামলার কারণে পুরো অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা বাড়ছে, যা বিদেশিদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছে ইরানকে কেন্দ্র করে। শনিবার ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে দেশটিতে সামরিক হামলা চালায়। পরবর্তী হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হয়েছেন বলে তেহরান থেকে নিশ্চিত করা হয়।
এই ঘটনার পরপরই ইরান পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাবে অঞ্চলজুড়ে নতুন করে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি কেবল ইরান বা ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার কানাডিয়ান নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা অবস্থান করছেন। নিবন্ধিত তথ্য অনুযায়ী ইরানে ২,৯৩২ জন, ইসরায়েলে ৬,০০৬ জন, বাহরাইনে ১,৪৩৮ জন, মিশরে ৭,২৩৮ জন, ইরাকে ৯৪৩ জন, জর্ডানে ৪,৪৬৯ জন, কুয়েতে ৪,০৭০ জন, লেবাননে ২৩,১৬৫ জন, ওমানে ৭৯৩ জন, ফিলিস্তিনে ৪৩৮ জন, কাতারে ৮,২৩৪ জন, সৌদি আরবে ১০,৯৪৮ জন, সিরিয়াতে ১,৪৮৪ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৩,০৬৪ জন এবং ইয়েমেনে ২২৭ জন বাসিন্দা আছেন। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, এই সংখ্যাগুলো চূড়ান্ত নয়। কারণ বিদেশে অবস্থানকারী কানাডিয়ানদের জন্য সরকারের কাছে নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক নয়। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বা কম হতে পারে। অনেকেই হয়তো ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন।
ইসরায়েল বা অন্য কোনো স্থানে সাম্প্রতিক হামলায় কোনো কানাডিয়ান নাগরিক হতাহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত ফেডারেল সরকারের কাছে নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ফেডারেল সরকারের এক বিবৃতিতে ইরানের সাম্প্রতিক হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী এবং এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি।
কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনীতা আনান্দ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। জানা গেছে, তিনি কুয়েত, ইসরায়েল, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, জর্ডান, যুক্তরাজ্য ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক আলোচনা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সংঘাত বাড়তে থাকলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এতে শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নয়, জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব রাজনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে কানাডা সরকার তাদের নাগরিকদের সতর্ক থাকার এবং অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি যারা ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছেন, তাদেরকে দ্রুত নিরাপদ বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

