
গত ৫ জানুয়ারী টরন্টোস্থ ইউনাইটেড জালালাবাদ ফাউন্ডেশন’র অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে প্রায় ৭.১৫ মিনিটে পৌছে গেলাম কেনেডি কনভেনশন হলে। মনে হচ্ছিল এ এক এলাহি কান্ড। লোকে লোকারন্য হলের ভিতর বাহির। নতুন পুরাতন সিলেটীদের এক মিলন স্থল হয়ে উঠেছিল পুরো এলাকা। নবাগত শত শত যুবক যুবতিদের কাউকেই চিনার উপায় নেই – সবারই মধ্যে যেন প্রাণ চাঞ্চল্য, আগ্রহী দৃষ্টি, আর ভবিষ্যতকে জয় করার এক দৃঢ় সংকল্প। আমার মনে পড়ে গেল স্কুল শেষ করে কলেছে প্রথম দিনের নবীন বরণ অনুষ্ঠানের কথা। ধীরে ধীরে ভিতরে গেলাম, ষ্টেজের কর্নারে গিয়ে পেয়ে গেলাম আমাদের কম্যুনিটির পুরাতন মেম্বারদেরকে যাদের সাথে প্রবাসের এই দীর্ঘ দিনের পথ চলা।
কোন অনুষ্ঠান বা ইভেন্টের সফলতা নির্ভর করে অর্গেনাইজিং কমিটি এবং সর্বোপরি আহবায়কের উপর। মঞ্চ সজ্জা ছিল চমতকার-বিশেষতঃ ডিজিটাল ডিস্প্লেতে বাংলা ইংরেজীতে প্রদর্শন বেশ এফেক্টিভ। Modern Approach শব্দ দুটো ব্যবহারের পেছনে আমার ব্যক্তিগত যে লজিক কাজ করেছে তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আহবায়ক তানভীর কোহিনূরের Subject matter expertise, Fat free communication and art of speaking. বাংলা ইংরেজী দুটোতে সমান দক্ষতা , বাংলাদেশী কালচার এবং কানাডীয় কালচার দুটোর সম্মক ধারনা ও তার ব্যাবহারে রয়েছে তানভীরের সমান দক্ষতা যার প্রতিফলন আমরা দেখেছি মঞ্চে। এই দক্ষতা electromagnetic influence র মতই কাজ করে বার্তা পৌছে দিয়েছে অডিয়েন্সের কাছে। এখানেই আয়োজনের স্বার্থকতা । অডিয়েন্সের সম্মুখে বসা শুধু বাংলাভাষীই ছিলেন না । ছিলেন টরন্টো সিটি মেয়র অলিভিয়া চাও, সাবেক ট্রাষ্টি ও বর্তমান কাউন্সিলর পার্থি কান্ডাভাল প্রমুখ । সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে যে আমাদের মেসেজটা পৌছে দেওয়ার জন্য বাংলা ইংরেজীতে সমান দক্ষ প্রেজেন্টার অত্যাবশ্যক। আমাদের কম্যুনিটির পরিচিত মুখ ফ্যামিলি ডক্টর মি: তরুন তার বক্তব্যটি ইংরেজীতেই ডেলিভারি করেছেন দেখে বেশ ভাল লেগেছে । পার্থি কান্ডাভালের বক্তব্যে একটি কথা খুব পরিস্কার ভাবে ঊঠে এসেছে যে এখানের পলিটিশিয়ান, সিটি এবং গভর্নমেন্ট মূলতঃ কমুনিটির সাথে কম্যুনিকেশনের জন্য প্ল্যাটফরম খুজতে থাকে; তার ভাষায় ইউনাইটেড জালালাবাদ ফাউন্ডেশন হয়ে ঊঠতে পারে সেই প্ল্যাটফরম ( contact point) এর একটি। সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে আমাদের মেসেজ পৌছে দেওয়ার জন্য প্রথম প্ল্যাটফরম , তারপর দক্ষতা , কানাডীয় সামাজিক-পলিটিক্স নিয়ে সম্মক ঞ্জান থাকা অত্যাবশ্যক । আমি উপস্থিত শিক্ষিত যুবক-তরুনদের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমান Deliverable Skills দেখেছি।
( দুই) সংগঠন ফরম করা সহজ ও নেতৃত্ব গ্রহন করাও সহজ কিন্তু সেই নেতৃত্বে যদি সমাজ, কম্যুনিটি দেশের কল্যান করার মানষিক দৈন্যতা থাকে তাতে আর কিছু হলেও সমাজের লাভ হয় না। Leadership Style or Management Style এর উপর নির্ভর করে একটি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন তার লক্ষ্য অর্জনে কতটুকু এগুতে সম্ভব হবে। Lead by example হচ্ছে একজন সত্যিকারের নেতার আদর্শ। এই সংগঠনের নেতৃত্বে যারা এসেছেন তাদের বেশীর ভাগই নতুন-কিন্তু কর্নধার দুলু ভাই ( দুলু চৌধুরী) আমাদের বাংলাদেশী কম্যুনিটির একজন পরীক্ষিত সমাজ সেবক । সুযোগ যেহেতু পেয়েই গেলাম তখন তার সম্পর্কে দুটো কথা না বললেই নয়। কোভিড’র সময় এই টরন্টো শহর যখন এক ভূতুরে গ্রামের রুপ নিয়েছিল , প্রতিদিন কম্যুনিটির কারো না কারো মৃত্যুর সংবাদ আসছিল –হস্পিটাল থেকে লাশ গ্রহন করতে যখন নিকটাত্মীয়জনকেও পাওয়া যেত না সেই ভয়াল মৃত্যুপুরীর দ্বারে দ্বারে গিয়ে লাশ গ্রহন করে কাঁধে নিয়ে গিয়ে গোসল দিয়ে দাফন করে আসা, মৃতের ফ্যামিলির সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেওয়া । নিজের ফ্যামিলির রিস্ক উপেক্ষা করে মৃত্যুকে বার বার আলিংগন করে যে মানুষটি রানারের মত দূর্বার ছুটে চলেছিলেন আহবায়ক তানভীর কোহিনূরকে সাথে নিয়ে তিনি আমাদের দুলু ভাই – আজকের ইউনাইটেড জালালাবাদ ফাউন্ডেশন’র সভাপতি। এর চেয়ে বেশী কিছু কম্যুনিটি সেবার উদাহরন দেওয়ার দরকার আছে কি? প্রসংগত উল্লেখ্য যে সেই দুঃসময়ে নবাগত ইমিগ্রান্ট, ইন্টারনেশনাল স্টুডেন্ট-এবং বিপদ্গ্রস্থ ও অভুক্ত কমিউনিটি মেম্বারদের দরজায় দরজায় খাবার পৌঁছে দেওয়া , ঘর ভাড়া দেওয়া , ডলার দিয়ে সাহায্য করা ইত্যাদি মহত কাজে যারা এগিয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে প্রয়াত ব্যারিষ্টার রেজোয়ান রহমান, নওশের আলী, ডলি বেগম, দুলু চৌধূরী, তানভীর কোহিনূর সহ আরো কয়েকজনের নাম কমিউনিটি কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করবে । সূতরাং একটি যোগ্য নেতৃত্বের হাতে সংঠনের দায়ীত্ব অর্পন হয়েছে-এবং সত্যিকারের কম্যুনিটি কাজের বাস্থবায়ন দেখবো বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
অনুষ্ঠানে পৌছাতেই হাতে আসলো “হাখম” নামে গোছানো সুন্দর একটি ম্যাগাজিন। প্রাইম মিনিস্টার জাস্টিন ট্রুডো, কেবিনেট মিনিস্টার বিল ব্লেয়ার , মেয়র অলিভিয়া চাও, এমপি নাথানিয়েল, এমপি সালমা জাহিদ, এমপিপি ডলি বেগম এর শুভেচ্ছা বাণী ম্যাগাজিন ও সংগঠনকে সমৃদ্ধ করেছে নিঃসন্দেহে। সাথে প্রকাশিত হয়েছে সিলেটের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে বেশ ক’টি লেখা যা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।
ম্যাগাজিনের সাথে পেয়েছি সংগঠনের প্রিন্টেড গঠনতন্ত্র । সম্পূর্ন পড়ার সময় হয়ে ঊঠে নাই । তবে “লক্ষ্য ওউদ্দেশ্য সেকশনে”র (ঝ)-যা কম্যুনিটির জন্য একটি ফিউনারেল প্রতিষ্টান গঠন করা হবে সত্যিকারের মহৎ কাজ। এবং আমার বিশ্বাস নতুন উদ্যোমী মেম্বারদেরকে নিয়ে সভাপতি এই কাজে সফল হবেন । ভবিষ্যতে কম্যনুটির জন্য অন্তত ১০টি কবর স্থান – অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য ফান্ডস, একটি নিজস্ব কমিউনিটি সেন্টার গড়ে তোলার মত প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করার জন্য আমাদের অনুরোধ থাকলো ।
দেশ থেকে অনুষ্ঠানে এসেছিলেন সেলিম চৌধূরী, সাথে ছিলেন স্থানীয় শিল্পীগন। চমৎকার একটি সন্ধ্যা উপহার দেওয়ার জন্য সকল আয়োজকদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

