
কানাডার অন্যতম সমৃদ্ধ শহর মিসিসোগা এখন এক অভাবনীয় বাস্তবতার মুখোমুখি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে “জরুরি অবস্থা” ঘোষণা করেছে শহর কর্তৃপক্ষ। বুধবার (৮ অক্টোবর) সিটি কাউন্সিলের সর্বসম্মত ভোটে এই প্রস্তাব পাস হয়, যা শহরটির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিটি অব মিসিসোগা এক বিবৃতিতে বলেছে, “খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এখন সংকটের সীমা ছাড়িয়ে এক মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। এটি আর সাময়িক কোনো অবস্থা নয়, বরং ক্রমবর্ধমান এক সামাজিক বাস্তবতা, যা শহরের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।”
এই ঘোষণার মাধ্যমে শহর কর্তৃপক্ষ শুধু সমস্যার স্বীকৃতি দেয়নি, বরং কার্যকর নীতিগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ফুড সিকিউরিটি ইমার্জেন্সি রেসপন্স ফান্ড বাড়ানো হবে, যাতে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা পরিবারগুলোকে দ্রুত সহায়তা দেওয়া যায়।
সিটি কাউন্সিল একটি নতুন কর্মসূচির প্রস্তাব দিয়েছে “Groceries and Essentials Benefit”, যার মাধ্যমে সংকটে থাকা পরিবারগুলো তাৎক্ষণিক খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবে। মেয়র বনি ক্রমবির মতে, “এটি কেবল দান বা ত্রাণ নয়, বরং নাগরিক অধিকারের অংশ হিসেবে খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা।”
মিসিসোগা কানাডার অন্যতম ধনী শহর। টরোন্টোর লাগোয়া এই নগরী ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং পরিবহন খাতে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু শহরের এই অর্থনৈতিক উত্থান সমানভাবে সবার জীবনে সুফল আনতে পারেনি। ফুড ব্যাংকস মিসিসোগার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য শহরের প্রায় ৭ লাখ ১৬ হাজার জনসংখ্যার মধ্যে প্রতি ১৩ জনে একজন, অর্থাৎ প্রায় ৮% বাসিন্দা এখন ফুড ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। মাত্র পাঁচ বছর আগে, অর্থাৎ ২০১৯ সালে এই হার ছিল প্রতি ৩৭ জনে একজন। অর্থাৎ ফুড ব্যাংক ব্যবহারের হার তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে।
শুধু তাই নয়, ২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত এক বছরে ফুড ব্যাংকে আগত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নিম্নআয়ের পরিবার, একক অভিভাবক ও নতুন অভিবাসীরা।
বাংলামেইলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেয়র বনি ক্রমবি বলেন, “আমাদের শহরে কেউ যেন ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে না যায় এখন সেটিই আমাদের অগ্রাধিকার। মিসিসোগা দ্রুত বেড়ে উঠছে, কিন্তু এর সঙ্গে দারিদ্র্যও ভয়াবহভাবে বাড়ছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই সংকট অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা একত্রে মিসিসোগার খাদ্য পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে। ভাড়া ও পরিবহন খরচ আয়ের বড় অংশ নিয়ে নিচ্ছে, অনেক কর্মজীবী মানুষ মাসের শেষে খাবারের ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছেন, আর অভিবাসীরা স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাবে দ্রুত দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়ছেন।
একজন স্থানীয় সামাজিক কর্মী বাংলামেইলকে বলেন, “আমরা প্রতিদিন এমন মানুষ দেখছি যারা আগে কখনো ফুড ব্যাংকে যাননি। এখন তারা বাধ্য হচ্ছেন সাহায্য নিতে। এটা শুধু দরিদ্রদের সমস্যা নয় এখন এটি মধ্যবিত্ত পরিবারেরও বাস্তবতা।”
মিসিসোগা সিটি প্রাদেশিক ও ফেডারেল সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে, খাদ্য নিরাপত্তাকে জাতীয় পর্যায়ের জরুরি ইস্যু হিসেবে স্বীকৃতি দিতে। প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে অন্টারিওর সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি (ODSP ও OW) উন্নত করতে হবে, সাশ্রয়ী আবাসনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, কর্মসংস্থান ও শ্রম অধিকার শক্তিশালী করতে হবে।
কানাডায় এর আগেও কিছু শহর খাদ্য নিরাপত্তা সংকট নিয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে, তবে মিসিসোগার মতো অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ শহরের এমন ঘোষণা সমাজে বড় বার্তা দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করছে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা এখন আর কেবল গ্রামীণ বা দূরবর্তী অঞ্চলের সমস্যা নয়; বরং শহুরে বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মিসিসোগার এই ঘোষণা শুধুমাত্র স্থানীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয় এটি কানাডার বৃহত্তর অর্থনৈতিক অসমতার এক প্রতিফলন। শহরের উঁচু দালান, বিলাসবহুল কন্ডো আর কর্পোরেট চাকরির ভেতরে লুকিয়ে আছে এক বাস্তবতা, যেখানে অনেক পরিবার প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে খাবার কিনবে, নাকি ভাড়া দেবে।
মিসিসোগার ঘোষণা হয়তো এক শহরের সংকেত, কিন্তু বাস্তবে এটি গোটা কানাডায় ছড়িয়ে পড়া এক নীরব মানবিক সংকটের প্রতিধ্বনি। এখন দৃষ্টি সবার প্রাদেশিক ও ফেডারেল সরকার কীভাবে এই সংকটের প্রতিক্রিয়া জানায়, এবং তারা আদৌ খাদ্যকে নাগরিক অধিকারের কেন্দ্রে এনে নীতিগত পরিবর্তন করতে পারে কি না।

