
কানাডার জাতীয় যাত্রীবাহী ট্রেন পরিষেবা ভায়া রেল (VIA Rail) এবং দেশের বৃহত্তম রেলপথ মালিক কানাডিয়ান ন্যাশনাল রেলওয়ে (CN)-এর মধ্যে এখন এক বিরল আইনি সংঘাত দেখা দিয়েছে। বিষয়টি শুধু ট্রেনের গতি নয় এটি রেলপথের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা এবং যাত্রীসেবার মান নিয়ে এক গভীর বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ভায়া রেল সম্প্রতি ফেডারেল আদালতে একটি বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার (Judicial Review) আবেদন জানিয়েছে, যেখানে তারা অভিযোগ করেছে সিএন কোনো বৈজ্ঞানিক বা আইনি ভিত্তি ছাড়াই তাদের নতুন সিমেন্স ভেঞ্চার (Siemens Venture) ট্রেনগুলোর ওপর নতুন গতিসীমা আরোপ করেছে। এর ফলে কুইবেক সিটি থেকে উইন্ডসর পর্যন্ত কানাডার ব্যস্ততম করিডোরে প্রতিদিন ট্রেন বিলম্বিত হচ্ছে, যাত্রীদের অসুবিধা বাড়ছে এবং ভায়া রেলের সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ভায়া রেল তাদের আদালত-দাখিল করা নথিতে বলেছে, সিএন-এর সিদ্ধান্ত একতরফা এবং অস্বচ্ছ। কোনো ধরনের নিরাপত্তা মূল্যায়ন, ঝুঁকি বিশ্লেষণ বা প্রযুক্তিগত পরামর্শ ছাড়াই হঠাৎ করে গতিসীমা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভায়ার বক্তব্য, “রেল ক্রসিংয়ে কোনো নতুন ঝুঁকি বা দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবুও সিএন স্বেচ্ছায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা আমাদের নিয়মিত অপারেশনকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং যাত্রীদের আস্থায় আঘাত করছে।”
তাদের দাবি, ১১ অক্টোবর থেকে এই গতিসীমা কার্যকর হওয়ায় সময়নিষ্ঠা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কুইবেক–উইন্ডসর করিডোর কানাডার সবচেয়ে ব্যস্ত যাত্রী রুট, যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ভ্রমণ করেন। বিলম্বের কারণে শুধু যাত্রীরাই নয়, দেশের রেল পরিবহনের সার্বিক দক্ষতাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
অন্যদিকে, সিএনের মুখপাত্র অ্যাশলি মিচনোভস্কি বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণরূপে নিরাপত্তা-নির্ভর। তার ভাষায়, “আমরা বহু দশকের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের ফলেই এই পদক্ষেপ নিয়েছি। রেল ক্রসিংগুলোতে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এটি কোনো প্রশাসনিক বাধা নয়, বরং জননিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য পদক্ষেপ।”
সিএনের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, ভায়া রেলের নতুন ভেঞ্চার ট্রেন চালু হওয়ার পরই এই সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়, যাতে নতুন প্রযুক্তির ট্রেনগুলোর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করা যায়।
ভায়া রেল পাল্টা যুক্তি দিয়েছে যে, তাদের নতুন সিমেন্স ভেঞ্চার ট্রেন দুই বছর ধরে কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই মন্ট্রিয়ল ও অটোয়া রুটে সফলভাবে চলেছে। সম্প্রতি ট্রেনগুলো মন্ট্রিয়ল-টরন্টো রুটেও চালু হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী এই আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ট্রেনে ভ্রমণ করছেন।
ভায়ার কমিউনিকেশন্স ডিরেক্টর জাঁ-ভিনসেন্ট ল্যাক্রোই বলেছেন, “সিএন আমাদের সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে। তাদের সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। এটি কেবল আমাদের পরিচালন স্বাধীনতাকে ব্যাহত করছে না, বরং আমাদের সুনাম ও যাত্রীদের আস্থা উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।”
রেল বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিরোধ কানাডার রেল খাতে অভূতপূর্ব এক নজির। সাধারণত সিএন রেলপথের মালিক এবং ভায়া রেল সেই ট্র্যাক ব্যবহার করে যাত্রী পরিবহন পরিচালনা করে। কিন্তু এবার প্রথমবারের মতো ট্র্যাক মালিক ও যাত্রীবাহী সংস্থার মধ্যে এত বড় প্রশাসনিক সংঘাত সামনে এলো।
রেল বিশ্লেষক মার্ক হেন্ডারসন বলেন, “যদি আদালত ভায়া রেলের পক্ষে রায় দেয়, তবে এটি রেলপথ ব্যবহারের নীতিতে এক মৌলিক পরিবর্তন আনবে। এতে ভবিষ্যতে সিএন-এর মতো বেসরকারি মালিকরা আর সরকারি যাত্রী পরিবহন সংস্থার ওপর একতরফা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারবে না।”
ভায়া রেলের নতুন ভেঞ্চার ট্রেনগুলো আধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত জ্বালানি সাশ্রয়ী, দ্রুতগামী, এবং উন্নত সিগন্যাল ও ব্রেকিং সিস্টেমে সজ্জিত। রেল প্রকৌশলীদের মতে, এই ট্রেনগুলোর নিরাপত্তা মান পুরনো মডেলগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। ফলে হঠাৎ গতিসীমা কমানোর কোনো প্রযুক্তিগত যুক্তি নেই বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে নিরাপত্তা বিষয়ক সিদ্ধান্তে “প্রতিরোধমূলক নীতি” প্রয়োগ করা সিএনের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। প্রতিষ্ঠানটি সাধারণত কোনো নতুন ট্রেন বা সিগন্যালিং সিস্টেম চালু হলে আগে ঝুঁকি কমিয়ে নিরাপত্তা মূল্যায়ন সম্পন্ন করে। তাই আদালত এখন এই প্রশ্নের মুখে সিএনের এই সিদ্ধান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় যৌক্তিক কিনা, নাকি ভায়া রেলের অপারেশন সীমিত করার অজুহাত মাত্র।
ফেডারেল আদালত এই মামলার শুনানি গ্রহণ করেছে। এখন সবার দৃষ্টি সেদিকেই আদালত কি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেবে, নাকি পরিচালন স্বাধীনতাকে? একদিকে হাজারো যাত্রী ভায়া রেলের সময়নিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য সেবা ফিরে পাওয়ার আশায় আছেন, অন্যদিকে সিএন বলছে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো আপস নয়। এই মামলার রায় শুধু ভায়া রেল ও সিএন নয়, বরং কানাডার গোটা রেল ব্যবস্থার নীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে।
কানাডার রেল খাতের এই দ্বন্দ্ব দেখিয়ে দিচ্ছে নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার সীমারেখা কতটা সূক্ষ্ম হতে পারে। আদালতের রায় যদি ভায়া রেলের পক্ষে যায়, তবে এটি যাত্রীসেবা সংস্থাগুলোর জন্য এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত হবে। আর যদি সিএনের পক্ষে যায়, তবে রেল নিরাপত্তা নীতি আরও কঠোর রূপ পেতে পারে।
ফলে এখন সবার চোখ ফেডারেল আদালতের দিকে যেখানে কানাডার রেল ইতিহাসের নতুন মোড় ঘুরছে।

