
ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর উত্তর আমেরিকার রাজনৈতিক ও মানবিক অঙ্গনে নতুন এক অস্থিরতার ইঙ্গিত মিলছে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে তার ঘোষিত “জিরো টলারেন্স” নীতি পুনরায় কার্যকর হওয়ার আশঙ্কায় কানাডার দিকে এখন চোখ রাখছে বিশ্ব। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত লাখো অনথিভুক্ত অভিবাসীকে উত্তরমুখী করে তুলতে পারে যার অভিঘাত পড়বে সরাসরি কানাডার সীমান্তে।
নির্বাচনে জয়লাভের পর প্রথম ভাষণেই ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, “আমরা আমাদের সীমান্ত বন্ধ করতে যাচ্ছি। যারা আসতে চান, তারা আসবেন বৈধ পথে, আইন মেনে।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন তার আগের মেয়াদের কঠোর অভিবাসন নীতিতে ফিরে যাওয়ার। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বিপুলসংখ্যক অবৈধ অভিবাসী আশ্রয়ের নতুন গন্তব্য হিসেবে কানাডাকে বেছে নিতে পারেন।
২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময় যুক্তরাষ্ট্রে বছরে গড়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষ দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেছেন যা ইতিহাসে নজিরবিহীন। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেই প্রবাহ কিছুটা কমেছে, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর নীতি ফিরে এলে অনেকেই দেশ ত্যাগ করে উত্তরের সীমান্তে, অর্থাৎ কানাডার দিকে ছুটতে পারেন।
এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। ২০১৭ সালে ট্রাম্প প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত হাজারো অভিবাসী কানাডার দিকে রওনা দিয়েছিলেন। বিশেষ করে কুইবেক প্রদেশের রক্সহ্যাম রোড হয়ে হাজারো মানুষ অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেন।
সেসময় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো টুইটারে এক মানবিক বার্তায় বলেছিলেন, “যারা নির্যাতন, ভয় বা যুদ্ধের কারণে পালাচ্ছেন, কানাডা তাদের স্বাগত জানাবে। বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি।”
তার এই মানবিক আহ্বান বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও, এর ফলেই কানাডা সীমান্তে অবৈধ অভিবাসনের ঢল নামে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে শুধু কুইবেক সীমান্ত দিয়েই প্রায় ৬০ হাজার মানুষ অবৈধভাবে কানাডায় প্রবেশ করেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত অভিবাসী।
বর্তমানে কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি চাপের মধ্যে আছে। কানাডার ইমিগ্রেশন, রিফিউজি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা (IRCC) এবং সীমান্ত নিরাপত্তা সংস্থা (CBSA) এখনও ২০২২–২৩ সালের আশ্রয় আবেদন ব্যাকলগ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। সরকারি হিসেবে, বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ অভিবাসন আবেদন প্রক্রিয়াধীন, যার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই শরণার্থী আবেদন।
অভিবাসন বিশ্লেষক হেনরি পলসন বলেন, “ট্রাম্পের জয়ের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইতিহাস বলছে, এক দেশের কঠোর নীতি অন্য দেশের জন্য নতুন মানবিক চাপ তৈরি করে। কানাডাকে এখনই প্রস্তুত হতে হবে, নইলে ২০১৭ সালের ঘটনাই আরও বড় আকারে ফিরে আসবে।”
তবে এই সতর্কতা সত্ত্বেও, ট্রুডো সরকারের কার্যকর প্রস্তুতির খুব বেশি লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। সীমান্তে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলেও, আশ্রয় কেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি বা আবেদন যাচাইয়ের নতুন কাঠামো গঠনের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা এখনও প্রকাশ পায়নি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য কঠোর নীতির কারণে বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষ মানবিক সঙ্কটে পড়বেন। যুক্তরাষ্ট্রের ঠান্ডা উত্তরের রাজ্যগুলো থেকে অনেকেই বরফে ঢাকা সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারেন যেমনটি ঘটেছিল ২০১৮ ও ২০১৯ সালে।
অন্যদিকে, কানাডার বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি সরকারকে কঠোর সমালোচনা করে বলছে, ট্রুডোর “ওপেন ডোর পলিসি” এখন দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের দাবি, সীমান্ত অতিক্রমকারীদের বিষয়ে স্পষ্ট আইন ও দ্রুত প্রক্রিয়া না থাকলে কানাডার সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন হবে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুধু মার্কিন রাজনীতির নয়, বরং কানাডার জন্যও এক বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ একদিকে মানবিক দায়িত্ব, অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা।
প্রশ্ন হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ও তার সরকার কি ২০১৭ সালের মতো মানবিক আহ্বান পুনরাবৃত্তি করবেন, নাকি এবার বাস্তববাদী নীতিতে অগ্রাধিকার দেবেন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণকে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, কানাডাকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ ট্রাম্পের নতুন যুগের প্রভাব এবার সীমান্ত পেরিয়ে তুষারঢাকা উত্তর দিকেও পৌঁছে গেছে যেখানে মানবিকতা ও বাস্তবতার সংঘাত আবারও সামনে আসতে চলেছে।

