
কানাডায় স্বাস্থ্যসেবা খাতে সরকারি ব্যয় এ বছর নতুন এক রেকর্ড ছুঁতে যাচ্ছে। দ্য কানাডিয়ান ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ইনফরমেশন (সিআইএইচআই)-এর সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশজুড়ে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩৭২ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার, যা গড়ে প্রতি নাগরিকের জন্য ৯,০৫৪ ডলার। আগামীকাল প্রকাশিত হতে যাওয়া সিআইএইচআই-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে আসবে।
সিআইএইচআই-এর জাতীয় বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৪ সালে স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় ৫.৭ শতাংশ, যা গত বছরের ৪.৫ শতাংশ ও ২০২২ সালের ১.৭ শতাংশ-এর তুলনায় অনেক বেশি। অর্থাৎ, মহামারির পর স্বাস্থ্য খাত আবার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং এর পেছনে কাজ করছে একাধিক কাঠামোগত ও সামাজিক পরিবর্তন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার অভিঘাত কাটিয়ে উঠে এখন কানাডার স্বাস্থ্যনীতি নতুন এক বাস্তবতায় পৌঁছেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বার্ধক্যজনিত রোগের বিস্তার এবং নতুন চিকিৎসা প্রযুক্তির দ্রুত গ্রহণ এই তিনটি কারণই স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের বোঝা বাড়াচ্ছে।
চলতি বছরের মোট স্বাস্থ্য ব্যয় কানাডার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১২.৪ শতাংশ যা মহামারি-পরবর্তী সময়ে দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ। দুই বছরের মহামারির ব্যতিক্রম বাদ দিলে এই হার এক নতুন মাইলফলক।
সাধারণত, যখন কোনো দেশের স্বাস্থ্য ব্যয় তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকে, তখন তা অর্থনৈতিক চাপের ইঙ্গিত দেয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কানাডার মতো উন্নত কল্যাণমূলক অর্থনীতিতে এটি অস্বাভাবিক নয় বরং এটি জনকল্যাণ বিনিয়োগের অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
সিআইএইচআই বলছে, স্বাস্থ্য ব্যয়ের এই বৃদ্ধি তিনটি প্রধান কারণে ঘটছে ১) জনসংখ্যা বৃদ্ধি: অভিবাসন ও প্রাকৃতিক বৃদ্ধির ফলে কানাডার জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২) বার্ধক্যজনিত চাপ: ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে মানুষের সংখ্যা এখন সর্বাধিক, যাদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পরিচর্যা ব্যয়বহুল। ৩) প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি: আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্র, রোবটিক সার্জারি, এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বিস্তারও ব্যয় বাড়াচ্ছে। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, ওষুধ ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার খরচ এখন জাতীয় বাজেটের বড় একটি অংশ দখল করে আছে।
২০২২ সালের হিসাবে, কানাডার জনপ্রতি স্বাস্থ্য ব্যয় বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ, যদিও তা এখনও যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি বা সুইডেনের মতো দেশের নিচে অবস্থান করছে। তবে সিআইএইচআই-এর ধারণা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই কানাডা এই দেশগুলোর কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।
কানাডিয়ান ডেন্টাল কেয়ার ও ফার্মাকেয়ার পরিকল্পনার বাস্তবায়নও ব্যয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। আগে যেসব নিম্নআয়ের মানুষ দাঁতের চিকিৎসা বা প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে পারতেন না, এখন তারা সরকারি পরিকল্পনার আওতায় এই সেবা পাচ্ছেন। ফলে জনস্বাস্থ্যের মান উন্নত হলেও, সরকারের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
অন্টারিও, কুইবেক ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার মতো প্রদেশগুলোতে হাসপাতাল ব্যয়, চিকিৎসক পারিশ্রমিক এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক প্রদেশই এখন বাজেট ঘাটতি মেটাতে ফেডারেল সরকারের অতিরিক্ত সহায়তার ওপর নির্ভর করছে।
এছাড়া, কোভিড-১৯-এর পর স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক চাপ, স্টাফ সংকট ও বেতন বৃদ্ধি মিলিয়ে হাসপাতাল পরিচালনা ব্যয় বেড়েছে গড়ে ১০–১২ শতাংশ পর্যন্ত। টেলিহেলথ সেবা সম্প্রসারণ, নতুন প্রযুক্তি সংযোজন ও প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র সংস্কারও ব্যয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেদন বলছে, বর্তমানে কানাডায় সরকারের মোট ব্যয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশই স্বাস্থ্য খাতে যাচ্ছে। তবুও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণে বিনিয়োগ। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা কেবল জীবনরক্ষা নয় এটি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কর্মক্ষমতা রক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও ভিত্তি।
সিআইএইচআই-এর এক মুখপাত্র বাংলামেইল-কে বলেন, “স্বাস্থ্য ব্যয়ের এই ক্রমবর্ধমান ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকতে পারে। তবে সরকার যদি কৌশলগত বিনিয়োগ ও নীতি সংস্কার চালিয়ে যায়, তাহলে এটি টেকসই পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।”
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দশকে শুধুমাত্র সরকারি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করলে কানাডার স্বাস্থ্য খাত অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়বে। বিকল্প হিসেবে তারা বেসরকারি অংশীদারিত্ব, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য কর্মসূচি এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডার স্বাস্থ্য খাত এখন “সংকট ও সুযোগের সন্ধিক্ষণে” দাঁড়িয়ে আছে। জনগণের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, আর সরকারকে সেই অনুযায়ী বাজেট পুনর্গঠন করতে হচ্ছে।
৩৭২ বিলিয়ন ডলারের ব্যয় শুধু এক পরিসংখ্যান নয় এটি এক অর্থে কানাডার সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানবিক অঙ্গীকার ও উন্নত কল্যাণরাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি।

