
বছরের সবচেয়ে ব্যস্ততম কেনাকাটার দিন হিসেবে আবারও কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে ব্ল্যাক ফ্রাইডে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঐতিহ্য হিসেবে শুরু হলেও আজ এটি কেবল সীমান্ত পেরিয়েই কানাডাসহ বিশ্বের বহু দেশে বাণিজ্যিক উন্মাদনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাসের শেষে ব্ল্যাক ফ্রাইডে, কিন্তু বিক্রয় ইতিমধ্যেই গত বছরের তুলনায় অনেক এগিয়ে গেছে এবং সাইবার মানডে পর্যন্ত এই প্রবণতা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
রিটেইল বিশ্লেষক ব্রুস উইন্ডার বাংলামেইলকে বলেছেন, “মাত্র দেড় দশকের মধ্যে ব্ল্যাক ফ্রাইডে কানাডিয়ান ক্রেতাদের কাছে এক অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। আগে ক্রেতারা বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে শপিং করতেন, এখন তারা নিজের দেশেই সেই উৎসবে অংশ নিচ্ছেন। এটি আর শুধুই একটি শপিং ডে নয়; বরং এটি পুরো এক সপ্তাহব্যাপী বাণিজ্যিক মৌসুমে পরিণত হয়েছে।”
উইন্ডারের মতে, “রিটেইলাররা এখন ব্ল্যাক ফ্রাইডের জন্য বিশেষ কোনো মূল্যনীতি সাজাচ্ছে না। বরং তারা প্রাথমিকভাবে ছাড় দিয়ে ক্রেতাদের আগ্রহ ধরে রাখছে। কারণ বড়দিনের আগে ক্রেতারা বড় কোনো মূল্যহ্রাসের আশা করেন না। ফলে শুরু থেকেই ছোটছোট ছাড় বা অফারই কার্যকর হচ্ছে।”
তবে এই বছর পরিস্থিতি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেক কানাডিয়ান পরিবারের ছুটির মৌসুমের বাজেট সীমিত। ফলে ক্রেতারা আগের চেয়ে বেশি দরকষাকষি করছেন এবং “সবচেয়ে ভালো দামে সেরা পণ্য” খুঁজে বের করার কৌশলে মনোযোগী হয়েছেন।

উইন্ডারের মন্তব্য, “এখন ক্রেতারা আগেভাগেই কেনাকাটা শুরু করে। কেউ কেউ নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই ছাড় ধরছেন। ফলে একদিনের ব্ল্যাক ফ্রাইডে এখন ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে উইক’-এ পরিণত হয়েছে। এটি খুচরা বিক্রেতাদের জন্য ইতিবাচক, কারণ বিক্রয় দীর্ঘ সময়ে ছড়িয়ে পড়ছে এবং চাপও কম হচ্ছে।”
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস, এ বছর কানাডায় ব্ল্যাক ফ্রাইডে বিক্রির মোট পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি। অনলাইন বিক্রয়ে এই প্রবৃদ্ধি আরও বেশি, বিশেষত পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, বিউটি পণ্য এবং হোম ডেকরের ক্ষেত্রে।
তবে অনলাইন কেনাকাটার সঙ্গে বাড়ছে প্রতারণার ঝুঁকি। সাইবার অপরাধীরা ভুয়া ওয়েবসাইট ও ফিশিং লিঙ্কের মাধ্যমে ক্রেতাদের ক্রেডিট কার্ড তথ্য হাতানোর চেষ্টা করছেন। কানাডিয়ান সাইবারনিরাপত্তা বিশ্লেষক লিটন কাজী বলেন, “এখন প্রতারকরা অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্তভাবে কাজ করছে। তারা এমন ইমেইল বা টেক্সট পাঠায়, যা দেখতে পুরোপুরি বৈধ মনে হয়। তাই ক্রেতাদের উচিত সরাসরি স্টোর বা অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে কেনাকাটা করা, কোনো লিঙ্কে ক্লিক না করা।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “আপনি যে পণ্যটি কিনতে চান, সেটি নিজে অনুসন্ধান করুন। কোনো অফারকে সরাসরি বিশ্বাস করবেন না। কারণ সাইবার অপরাধীরা সাধারণত ‘অত্যন্ত আকর্ষণীয় অফার’-এর মাধ্যমে গ্রাহকদের ফাঁদে ফেলে।”
খুচরা বিক্রেতাদের মতে, ব্ল্যাক ফ্রাইডে এখন শুধু বিক্রির দিন নয়, বরং শীতকালীন মৌসুমে কানাডার বাজারে নগদ অর্থ প্রবাহকে সক্রিয় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ইঞ্জিন। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক মুনাফার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই আসে এই এক সপ্তাহের বিক্রি থেকে।
বাংলামেইলের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, “ব্ল্যাক ফ্রাইডে এখন কানাডিয়ান ভোক্তা সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অর্থনৈতিক মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি বা জীবনযাত্রার ব্যয় কোনোটিই এই উচ্ছ্বাস কমাতে পারেনি। বরং ক্রেতারা এখন আগের চেয়ে আরও সচেতন, আরও পরিকল্পিত এবং প্রযুক্তিনির্ভর কেনাকাটায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। এটা কেবল একটি বাণিজ্যিক দিন নয়; এটি কানাডিয়ান অর্থনীতির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সূচক।”

