
কানাডার শীতপ্রেমীরা এবারও তুষারময় শীতের জন্য অপেক্ষা করছেন। তবে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শীতের তীব্রতা ও স্থায়িত্বে বড় পার্থক্য দেখা দিতে পারে। চলমান জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রভাবে এবার শীত হতে পারে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা বৈচিত্র্যময়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ এবং ঠান্ডা পানির প্রবাহের দ্বন্দ্ব শীতের ধরন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গত বছর কানাডা অভিজ্ঞতা করেছে এল নিনো প্রভাবের, যা সাধারণত উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ার সঙ্গে যুক্ত। এর ফলে অনেক অঞ্চলে প্রত্যাশার চেয়ে কম তুষারপাত এবং তুলনামূলক উষ্ণ শীত দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি তার উল্টো হতে পারে।
লা নিনো-এর বিপরীতে লা নিনার অবস্থার মতো আবহাওয়াগত প্রভাব যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠতল ঠান্ডা হয়ে যায় সক্রিয় হলে, কানাডার পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে তাপমাত্রা কমে যেতে পারে এবং বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত বেড়ে যেতে পারে। যদিও লা নিনো পুরোপুরি সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত, তবে এর আংশিক প্রভাব অনেক প্রদেশে অনুভূত হতে পারে।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, আলবার্টা, দক্ষিণ-পশ্চিম সাস্কাচুয়ান এবং দক্ষিণ ইউকনের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা কম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে এই অঞ্চলে তীব্র শীত এবং ভারী তুষারপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। স্কি রিসোর্টগুলোর জন্য এটি আশার খবর, কারণ পর্যটকদের সংখ্যা বাড়তে পারে।
সাস্কাচুয়ানের মধ্য ও উত্তর অংশ, উত্তরপশ্চিম টেরিটরি এবং ম্যানিটোবারের বেশিরভাগ অঞ্চল স্বাভাবিক শীতল আবহাওয়ার মধ্যে থাকবে। এই অঞ্চলে মাঝারি মাত্রার তুষারপাত হলেও দীর্ঘস্থায়ী ঠান্ডা আবহাওয়া বিরাজ করবে না। অন্টারিওর উত্তরাঞ্চলেও তাপমাত্রা প্রায় স্বাভাবিক থাকবে। তবে দক্ষিণ অন্টারিও বিশেষ করে টরন্টো ও আশপাশের এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা উষ্ণ থাকতে পারে। এর ফলে শহরাঞ্চলে বরফের পরিবর্তে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
কুইবেক, প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড এবং নিউফাউন্ডল্যান্ডে তাপমাত্রা গড়ে কিছুটা বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় পরিবহন, কৃষি এবং জ্বালানি খাতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নুনাভাটের প্রায় পুরো অঞ্চলেই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ থাকতে পারে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিফলন।
কানাডিয়ান কৃষি খাতের জন্য এ ধরনের বৈচিত্র্যময় শীত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমাঞ্চলে ভারী তুষারপাত বসন্তকালীন রোপণ মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা বাড়াতে পারে, যা শস্য উৎপাদনে সহায়ক হবে। অন্যদিকে, পূর্বাঞ্চলে উষ্ণ আবহাওয়া এবং বৃষ্টিপাতের প্রবণতা শস্যের জন্য আলাদা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ কানাডার এক জ্যেষ্ঠ আবহাওয়া বিশ্লেষক বাংলামেইলকে বলেন, “লা নিনো পুরোপুরি সক্রিয় হবে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে প্রশান্ত মহাসাগরের ঠান্ডা পানির প্রবাহ কানাডার পশ্চিমাঞ্চলে ঠান্ডা শীত আনতে পারে, একই সঙ্গে পূর্বাঞ্চলে উষ্ণ বায়ু প্রবাহ সক্রিয় থাকতে পারে। ফলে এই বছর শীতের চিত্র হবে বৈচিত্র্যময়।”
তিনি আরও বলেন, “যদিও আমরা ক্লাসিক লা নিনো অবস্থায় নেই, তবু প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা হ্রাস এবং বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনের কারণে পশ্চিমাঞ্চলে ঠান্ডা বাতাসের প্রবাহ বেড়ে যেতে পারে। এর মানে স্কি রিসোর্টগুলো ব্যস্ত থাকবে, কিন্তু পূর্বাঞ্চলের শহরগুলোতে বরফের বদলে বৃষ্টি হতে পারে।”
কানাডার শীত এবারে হতে যাচ্ছে বৈচিত্র্যময় এবং আঞ্চলিকভাবে অসম। কেউ পাবেন জমাটবাঁধা তুষার, আবার কেউ অপেক্ষা করবেন বরফের পরিবর্তে বৃষ্টিপাতের জন্য। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “কানাডিয়ানদের শীতের প্রত্যাশা বরাবরের মতোই তীব্র, তবে প্রকৃতি এবারে হয়তো একটু আলাদা গল্প লিখছে।” জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে, কানাডার শীত আর একরকম নয় এটি এখন অঞ্চলভেদে ভিন্ন, অনিশ্চিত এবং পরিবর্তনশীল।

