
কানাডা সাহিত্য উৎসব ২০২৬-এর সূচনা বক্তব্যে একত্রিশ গ্রন্থের লেখক-অনুবাদক ও সাহিত্য সংগঠক সুব্রত কুমার দাস কানাডার মূলধারার সাহিত্যের সাথে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখার জন্য বাঙালি সাহিত্যিকদের যুথবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। মূলধারার কাছে সাহিত্যিকরা সম্মান পেলে প্রবাসে বাঙালি ডায়াস্পোরাও সম্মান লাভ করবে। বহুভাষাভাষী মানুষের দেশ কানাডার বৃহত্তর টরন্টোর আরেক শহর মিসিসাগায় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল তিনদিনব্যাপী কানাডা সাহিত্য উৎসব ২০২৬। চমৎকার আবহাওয়ায় রৌদ্রোজ্জ্বল ১৫, ১৬ ও ১৭ই মে তিনদিনব্যাপী মিসিসাগার ’সম্প্রদায় থিয়েটার ও স্টুডিও’ হলে অনুষ্ঠিত সাহিত্য উৎসবে ইংরেজি ভাষার লেখকদের সাথে অন্যান্য বেশ কটি ভাষার অসংখ্য অভিবাসী লেখক যোগ দিয়েছিলেন।
তিনদিনব্যাপী উৎসবের অনুষ্ঠানমালায় সকল ভাষার জন্য পৃথক পৃথক সেশন রাখা হয়েছিল। অন্যান্য ভাষার মধ্যে হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবী, উড়িয়া, মালয়ামালম প্রভৃতির পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক নন্দিত বাঙালি লেখক-কবি-গবেষক ও অনুবাদকবৃন্দ সাহিত্য উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। শুধু টরন্টো নয়, গ্রেটার টরন্টোর বিভিন্ন শহর ও অন্টারিও প্রদেশের কাছে-দুরের অন্যান্য শহর থেকেও অনেক লেখক সাহিত্য উৎসবে যোগদান করেন।
বাঙালি লেখকদের দীর্ঘ তিনঘন্টার আনন্দ-উৎসবে ভরপুর অনুষ্ঠানটি ছিল উৎসবের শেষ দিন ১৭ই মে রবিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত। রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনটির তাপমাত্রাও ছিল চমৎকার! বাঙালিদের অনুষ্ঠানটি পরিকল্পিতভাবে চারটি পর্বে ভাগ করা ছিল। প্রথম পর্বে ছিল কানাডীয় সাহিত্যকর্মের বাংলা অনুবাদ। এ অংশটিতে ছিলেন প্রবীণ লেখক ও অনুবাদক ড. দিলীপ চক্রবর্তী, লেখক ও চিন্তক আকবর হোসেন, লেখক ও অনুবাদক সুজিত কুসুম পাল, এবং সঞ্চালনায় ছিলেন বুয়েটিয়ান লেখক মনীষ পাল। তারা কানাডীয় সাহিত্যের বাংলায় অনুবাদ ও বাংলা সাহিত্যের ইংরেজিতে অনুবাদের নানাবিধ প্রসঙ্গ, অনুবাদের সময় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সুবিধা-অসুবিধা বিষয়ে আলোকপাত করেন, যা অন্যদের কাছে শিক্ষণীয়। তাদের মতে কানাডায় সাহিত্যকর্মে নিয়োজিত থাকতে ও মূলস্রোতের সাহিত্যে প্রাসঙ্গিক থাকতে ইংরেজি সাহিত্যকর্মের সাথে যোগসুত্র গড়ে তোলা এবং সৃজনশীলতা অব্যাহত রাখার জন্য সাহিত্য পাঠের প্রয়োজন। এ পর্বে ড. দিলীপ চক্রবর্তীর দীর্ঘ জীবনের ইংরেজি সাহিত্য-সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় ছিল। নিভৃতচারী স্বভাবের আকবর হোসেনের অনুবাদ ও লেখার অভিজ্ঞতা, এবং সুজিত কুসুম পালের অনুবাদসাহিত্য নিয়ে তার সক্রিয়তা সকলকে অনুবাদ সাহিত্যকর্মের প্রতি প্রলুব্ধ করে তোলে।
দ্বিতীয় পর্বে ছিল কানাডায় বসবাস করে বাংলায় লেখালেখির সুবিধা-অসুবিধা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়। অংশ নিয়েছিলেন প্রবাসী লেখিকা ও অঙ্কনশিল্পী তেহজিনা এমদাদ, লেখক স্বপন কুমার দেব, লেখিকা জাহান সৈয়দ, এবং সঞ্চালনায় ছিলেন লেখিকা ড. জান্নাতুল ফেরদৌস। তাদের আলোচনায় কানাডায় এসে নারী হিসাবে একদিকে জীবনযাপনের সংগ্রাম, অন্যদিকে সৃজনশীলতা টিকিয়ে রাখার সংগ্রামের দ্বিবিধ দায়িত্ব ফুটে ওঠে। শিল্পী-লেখিকা তেহজিনা এমদাদ একজন চমৎকার চিত্রশিল্পী, যিনি তাঁর পেশার সাথে লেখালেখিকে মিলিয়ে নিয়েছেন। পেশায় শিশুদের নিয়ে কাজের সুবাদে তিনি শিশুতোষ লেখাকে দ্বিভাষিক (বাংলা ও ইংরেজি) করে শিশুমনকে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে নিজেই ছবি আঁকেন। এমনকি তাঁর পাঁচটি প্রকাশিত বইয়ের প্রচ্ছদও তাঁর নিজের করা। লেখক স্বপন কুমার দেব নিয়মিত লেখেন গল্প, নিবন্ধ ও ভ্রমণ কাহিনী। তারও রয়েছে পাঁচটি প্রকাশিত বই। কবি-লেখিকা জাহান সৈয়দের রয়েছে তিনটি প্রকাশিত কবিতার বই। নিয়মিত লেখালেখি করেন কবিতা ও ছোটগল্প। সঞ্চালক হলেও ড. জান্নাতুল ফেরদৌস নিজে একজন কবি ও লেখক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর পিএইচডি’র গবেষণাকর্ম বই হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে। নিয়মিত লেখালেখি করেন পদ্য, কবিতা, ছোটগল্প ও গদ্য।
তৃতীয় পর্বে ছিল কবি ও কবিতা নিয়ে আবৃত্তি ও আলাপচারিতা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন টরন্টোয় বসে বাংলা ও ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চারত কবি-লেখক হোসনে আরা জেমী, কবি রোকসানা পারভিন শিমুল, কবি তাসলিমা হাসান, এবং এ পর্বটি সঞ্চালনায় ছিলেন নাট্য নির্দেশক সংগঠক ও আবৃত্তিকার লেখক আহমেদ হোসেন। হোসনে আরা জেমী লেখালেখিতে যেমন সক্রিয় তেমনি সক্রিয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। তাঁর রয়েছে বারোটি প্রকাশিত বই। রোকসানা পারভিন শিমুলের রয়েছে তিনটি কবিতার বই ও একটি ছোটগল্পের বই। তিনি নিয়মিত লিখে চলেছেন। তাসলিমা হাসানও নিয়মিত লিখে চলেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৪। তিনি কবিতা, ছোটগল্প, স্মৃতিচারণ, ইত্যাদি লিখে থাকেন। মঞ্চে প্রয়াত স্বামী কবি ইকবাল হাসানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আবেগায়িত হয়ে পড়েন! এ পর্বের লেখিকারা তাদের জীবনের নানারকম ঘটনাবলী ও লেখালেখির সাথে ব্যক্তিজীবনের রসায়ন তুলে ধরেন, যা অন্যদেরকে অনুপ্রাণিত করে। এ পর্বের সঞ্চালক সবাইকে মাতিয়ে রাখেন। লেখিকাদের কাছ থেকে বের করে আনেন তাদের লেখালেখির মৌলিক প্রবণতা।
শেষ পর্বে ছিল কানাডায় বসবাসরত পাঁচজন কবি ও লেখকের সম্প্রতি প্রকাশিত বইয়ের মোড়ক উন্মোচন। এ পর্বটি সঞ্চালনায় ছিলেন বাংলা সাহিত্যিকদেরকে স্থানীয় মূলধারার সাহিত্যের সাথে সংযোগ ঘটানোর কাজে নিবেদিতপ্রাণ লেখক-গবেষক-সংগঠক সুব্রত কুমার দাস। পাঁচজন কবি ও লেখকের মধ্যে ছিলেন কবি-লেখক-সাংবাদিক-সম্পাদক আতোয়ার রহমান। তাঁর প্রকাশিত ছোটগল্প বইয়ের সংখ্যা দু’টি। মঞ্চে ছিলেন তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত ছোটগল্পের বই ’মধ্যরাতের শিকার’ নিয়ে। প্রকৌশলী-লেখক সুশীল কুমার পোদ্দার উপস্থিত ছিলেন তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত বই ’অবলাচরণ’ নিয়ে। তিনি বিজ্ঞানবিষয়ে লেখেন। পাশাপাশি কবিতা ও গদ্য নিয়মিত লিখে চলেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিনটি। প্রকৌশলী লেখক স্বপন সিকদার ছিলেন তাঁর আত্মজৈবনিক গদ্যের বই ’অফুরন্ত ভালবাসা’ নিয়ে। তিনিও নিয়মিত লিখে চলেছেন। ২০২৬-এ প্রকাশিত ’সিঙ্গেল মাদার’ উপন্যাস নিয়ে ছিলেন অনেকগুলি উপন্যাসের লেখক জাকারিয়া মুহাম্মদ ময়ীন উদ্দিন। তার বইয়ের সংখ্যা এবং নিয়মিত লিখে চলেছেন। অখিল সাহা তার ২০২৬ একুশে বইমেলায় প্রকাশিত দ্বিতীয় কবিতার বই ’ইঁদুরগিবৎ পর্ব’ নিয়ে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দু’টি। একটি ভ্রমণ কাহিনী ’ট্রাভেলগ আমেরিকা-১ম খণ্ড’ ছাপা চলছে, যেটি সাপ্তাহিক আজকাল পত্রিকায় ৩৬ পর্বে প্রকাশিত হয়েছিল। সুব্রত কুমার দাসের সঞ্চালনায় ও কবি-লেখকদের আলাপচারিতায় পর্বটি মনোগ্রাহী হয়ে ওঠে। সুব্রত কানাডীয়ান লেখকদের সাথে বাঙালি লেখকদের মেলবন্ধনের কাজ নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছেন। তাঁর ঝুলিতে আছে দু’দুটি পুরস্কার। প্রথমটি নালন্দা বেস্ট কানাডিয়ান বাঙালি লেখক পুরস্কার ২০২৩ এবং দ্বিতীয়টি হলো গায়ত্রি গ্যামার্স মেমোরিয়াল পুরস্কার ২০১৮। ২০২১ সালেও তিনি বেস্ট কানাডীয়ান ইমিগ্রান্ট পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিলেন।
সাহিত্য উৎসব ২০২৬-এর প্রত্যেক পর্বের শেষে কিছু সময় ছিল দর্শক-শ্রোতাদের জন্য প্রশ্নোত্তর পর্ব। অনুষ্ঠানে আগত তরুণেরা অনুবাদ-বিষয়ক ও অন্য ভাষার দর্শকেরা নানান কৌতুহলী প্রশ্ন করেন। সাহিত্য উৎসবের বাংলা অংশের আয়োজনে মিডিয়া পার্টনার ছিল এনআরবি টেলিভিশন এবং বাংলামেইল পত্রিকা। অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন দীপক সুত্রধর। কানাডার বাঙালিদের সাহিত্যচর্চার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আইনজীবি ব্যারিস্টার শামীম আরা সাহিত্য উৎসবেও তাঁর উষ্ণ হাত এগিয়ে দিয়েছিলেন। আগামী বছরের সাহিত্য উৎসবের জন্য লেখকবৃন্দ একবছর অপেক্ষা করবেন।

