
টরন্টোর বাঙালি কমিউনিটির অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় মুখ মাছুমুর রহমান বাপ্পী এবার ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপ ২০২৬-এর ভলেন্টিয়ার সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল তাঁর গভীর ভালোবাসা। সিলেট নগরীর মেন্দিবাগ এলাকার সন্তান বাপ্পী রহমান বর্তমানে কানাডায় বসবাস করলেও নিজের শেকড় ও কমিউনিটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত রয়েছেন। শৈশবের সেই স্বপ্নই এবার নতুন এক মাত্রায় বাস্তব রূপ পেতে চলেছে।
ব্যক্তিগত জীবনে দীর্ঘদিনের হসপিটালিটি খাতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ফুটবলের প্রতি তাঁর ভালোবাসাও কখনো কমেনি। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপ ২০২৬ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রীড়া আয়োজন, আর সেই মহাযজ্ঞের অংশ হতে পেরে তিনি গর্বিত।
২০২৫ সালের আগস্ট মাসে তিনি ফিফার ভলেন্টিয়ার প্রোগ্রামে অনলাইনে আবেদন করেন। জানা গেছে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০ লক্ষেরও বেশি আবেদন জমা পড়েছিল। সেখান থেকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের তালিকায় জায়গা করে নেন বাংলাদেশি-কানাডিয়ান বাপ্পী রহমান।
ফিফা ওয়ার্ল্ডকাপ ২০২৬-এর ভলেন্টিয়ার প্রোগ্রামে কানাডা থেকে প্রায় ৩ লাখ ৮৭ হাজার আবেদন জমা পড়েছিল। এর মধ্যে শুধু টরন্টো থেকেই আবেদন করেছিলেন প্রায় ২ লাখ ৪৮ হাজার মানুষ। সবশেষে টরন্টো হোস্ট সিটির জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে মাত্র প্রায় ৩ হাজার ভলেন্টিয়ারকে।
অর্থাৎ, টরন্টোতে ভলেন্টিয়ার হিসেবে সুযোগ পাওয়া ছিল অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ—গড়ে প্রতি ৮০ জনেরও বেশি আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র একজন এই সুযোগ পেয়েছেন।
বাপ্পী রহমান জানান, ভলেন্টিয়ারিং ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল দেশের মাটিতেই। প্রথমে স্কাউট আন্দোলনের মাধ্যমে, পরে রোটারি ক্লাব ও রেড ক্রিসেন্টের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। এছাড়াও স্বেচ্ছায় রক্তদান, বৃক্ষরোপণ, পোলিও টিকাদান কর্মসূচি, ট্রাফিক সচেতনতাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, এসব অভিজ্ঞতাই তাঁকে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।
বাপ্পী রহমান বলেন, “আমার এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। আবেদন, নির্বাচন, সাক্ষাৎকার, শিফট অ্যাসাইনমেন্ট এবং ব্যাকগ্রাউন্ড চেকসহ নানা ধাপ অতিক্রম করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে এটি ছিল একটি দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জিং পথ। অনেক চেষ্টা, ধৈর্য এবং মহান আল্লাহর ইচ্ছায় অবশেষে আমি নির্বাচিত হয়েছি এবং আমার সব প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।”
এই সুযোগ পাওয়ার খবর প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি তিনি। তাঁর ভাষায়, এত বড় মঞ্চে কাজ করার সুযোগ পাওয়া স্বপ্নপূরণের সমান। প্রবাসে একজন বাংলাদেশি-কানাডিয়ান হিসেবে ভলেন্টিয়ারিং শুধু সেবামূলক কাজ নয়, বরং বিশ্বের সামনে নিজের দেশ ও কমিউনিটিকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার এক অনন্য সুযোগ।
তিনি মনে করেন, ভলেন্টিয়ারিংয়ের মাধ্যমে যেমন দেশের সম্মান বৃদ্ধি পায়, তেমনি ব্যক্তিগতভাবে নেতৃত্বগুণ, সক্ষমতা এবং যোগাযোগ দক্ষতাও উন্নত হয়।
বিশ্বকাপ চলাকালীন ভলেন্টিয়ারদের সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বাপ্পী রহমান। যাঁদের এতদিন টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছেন, এবার তাঁদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাবেন তিনি। বিশেষ করে প্রিয় ফুটবলার লিওনেল মেসিকে কাছ থেকে দেখার সম্ভাবনায় তিনি উচ্ছ্বসিত। যদিও কড়া নিয়মকানুন ও পেশাদার আচরণবিধি মেনে দায়িত্ব পালন করতে হবে সব ভলেন্টিয়ারকে।
এবারের বিশ্বকাপে মেসি, রোনাল্ডোসহ বিশ্বের শীর্ষ তারকা ফুটবলারদের খেলা কাছ থেকে দেখার অপেক্ষায় দিন গুনছেন তিনি।
সিলেটের মেন্দিবাগ থেকে শুরু হওয়া এক তরুণের স্বেচ্ছাসেবী পথচলা আজ পৌঁছে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরের মঞ্চে। এটি শুধু বাপ্পী রহমানের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্যও গর্বের এক অনন্য অধ্যায়।

