
গত ১ অক্টোবর টরন্টোর অন্টারিও লেইকের জলে ধর্মীয় সকল আচার মেনে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। এই আয়োজনে প্রশাসনিক সকল নিয়ম যেমন মান্য করা হয়, তেমনি পরিবেশগত সকল বিধিও পালন করা হয়।
সেপ্টেম্বর মাসের ১৬ তারিখে টরন্টো দুর্গাবাড়ি কর্তৃপক্ষ প্রথমবারের মতো ঘোষণা দেন যে, এ বছর মা দুর্গার বিসর্জন হবে উডবাইন বীচে – লেইক অন্টারিওর জলে। এই সংবাদ শুধু জিটিএ-র মানুষদের নয়, সারা উত্তর আমেরিকার বাঙালিদের মধ্যে এক শিহরণ জাগিয়ে তোলে।
জানা যায়, দশমীর দিন অর্থাৎ দশমীতে সিঁদুর দানের পর মা দুর্গার একটি রেপলিকা ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হবে বার্চমাউন্ট রোডে অবস্থিত দুর্গাবাড়ি থেকে ড্যানফোর্থ রোড হয়ে ড্যানফোর্থ এভিনিউ ধরে উডবাইন দিয়ে লেইকের পাড়ে উডবাইন বীচে। সেখানে থাকবে ফ্রি পার্কিং। করা হবে স্টেজ। স্টেজে ঠাকুর স্থাপন করে ভক্তরা আরতী-আনন্দ করবেন। তারপর হবে বিসর্জন।
সামগ্রিক আয়োজনের এইসব সংবাদ অন্টারিওর শত সহস্র বাঙালিকে উদ্দীপিত করে তোলে। চারিদিকে বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই শুরু হয়ে যায় দুর্গাপূজা। ২৭ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠী দিয়ে শুরু করে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী পার করে চলে আসে দশমী।
১ অক্টোবর দশমীর দিনে ১১টা বাজার আগেই দুর্গাবাড়ি মন্দিরের আঙিনায় জড়ো হতে থাকেন ভক্তরা। আসে ট্রাক। তাতে আগেই দৃঢ়ভাবে রাখা ছিল মা দুর্গার রেপ্লিকা। মন্দিরে ঠাকুর বিসর্জন শেষে নবপত্রিকা বা কলাবউকে তোলা হয় ট্রাকের উপর। ১২টার সময় যাত্রা শুরু হয়।
পেছন পেছন চলতে শুরু করে শতাধিক গাড়ি – সিঁদুর রাঙানো ভক্তরা তখন বিসর্জনের বেদনায় ধীর, কিন্তু বিদেশের মাটিতে দেশের আঙ্গিকে বিসর্জনের স্বপ্নে বিজয়ীর আনন্দে মাতোয়ারাও ছিলেন তাঁরা। তাঁদের উৎসাহ ছিল চোখে পরার মতো।
উডবাইন বীচে গিয়ে দেখা যায় সেখানে পূর্বপরিকল্পনামতো রয়েছেন টরন্টো পুলিশের কয়েকজন সদস্য। ধীরে ধীরে ট্রাক থেকে নামানো হয় মায়ের প্রতিমূর্তি এবং নবপত্রিকা। বিপুল আনন্দে বাজতে থাকে ঢাক ও কাসর। বাতাসে উড়তে থাকে ধুপের রঙিন ধোয়া। অচিন্তিতপূর্ব এক আবেশে মিশে যান উপস্থিত জাতি-ধর্ম নির্বিশেষের প্রায় হাজারখানেক মানুষ। ভক্তরা বহন করে নিয়ে চলেন ঠাকুরের কাঠামো। মুহূর্তেই উডবাইন বীচ হয়ে ওঠে বাংলাদেশের যে কোনো নদীতীরে ভাসানের সমতুল একটি পবিত্র ভূমি।
এরপর ইতোপূর্বে প্রস্তুত স্টেজে স্থাপন করা হয় মায়ের রেপ্লিকা এবং নবপত্রিকা। ঢাকের তালে তালে নাচতে নাচতে শুরু করেন সকল নারী-পুরুষ। সকলের ভক্তি নিবেদনের শেষে প্রথমে নবপত্রিকা জলে স্পর্শ করানো হয়। শেষে হার্ডবোর্ডের তৈরি মায়ের প্রতিমূর্তি লেইকের জলে নামানো হয় এবং ধর্মীয় বিধানমতো বিসর্জন দিওয়া হয়।
উল্লেখ করা যেতে পারে যে, রেপ্লিকাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে পরিবেশ দূষণের কোনো অভিযোগ না আসে। আরও উল্লেখ করা যায় যে, মা দুর্গার রেপ্লিকাটি জলে নামিয়ে পরে তুলে নিয়ে আসা হয়।
মহতী এই আয়োজনে শুধু যে গ্রেটার টরন্টোর বাঙালিরাই ছিলেন তা নয়। দূর দূর শহর যেমন এজাক্স, পিকারিং, মারখাম, মিসিসাগা, গুয়েলফ, ব্রাম্পটন, মিল্টন, হ্যামিল্টন, বেরি, কিচেনার, লন্ডন প্রভৃতি শহর থেকে আগত দর্শনার্থীদের উৎসাহও ছিল রীতিমতো চোখে পড়ার মতো।
উত্তর আমেরিকার একটি শহরে ফেলে আসা দেশের মতো করে ধর্মীয় আচার মেনে বিসর্জন রীতিমতো একটি ঈর্ষণীয় পদক্ষেপ। টরন্টো দুর্গাবাড়ি এই অচিন্তিতপূর্ব উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সকলের আন্তরিক অভিনন্দন দাবীদার। এই বিসর্জন ছিল উত্তর আমেরিকার সকল বাঙালির জন্য অভাবিতপূর্ব এক অভিজ্ঞতা, যে অভিজ্ঞতার শিক্ষা আমাদের নিয়ে যাবে আরও দূর, বহুদূর।

