
টরন্টোর শরতের উষ্ণ এক দুপুর। অক্টোবরের শেষ দিন। রোদঝলমলে সেই বিকেলটা ছিল শহরের ইতিহাসে এক বেদনাময় মুহূর্ত চিরবিদায় নিচ্ছে উত্তর আমেরিকার অন্যতম প্রাচীন ও জনপ্রিয় বিজ্ঞানকেন্দ্র অন্টারিও সায়েন্স সেন্টার। ৩১ অক্টোবর, বুধবার। দুপুরের দিকে কর্মীরা যখন শেষবারের মতো ভবন ছেড়ে বেরিয়ে আসছিলেন, তখন শুধু একটি কর্মস্থল নয়, জীবনের এক অধ্যায়কেও যেন বিদায় জানাচ্ছিলেন তারা।
বিশাল প্রাঙ্গণজুড়ে নিস্তব্ধতা। কোথাও নেই দর্শনার্থীর ভিড়, নেই শিশুদের হাসির শব্দ, নেই বৈজ্ঞানিক প্রদর্শনীর কৌতূহল জাগানো আলোছায়া। এমা মিডলি ডানফি, দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাসেবী সমন্বয়ক, সেদিন শেষবারের মতো কেন্দ্রের প্রতিটি কোণে ঘুরে বেড়ান।
বাংলামেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন “আমি প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি প্রদর্শনী কক্ষে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। মনে হচ্ছিল, এই দেয়াল, এই স্পেস, এই গন্ধ সব আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। মানুষগুলোকে আর দেখব না, সেই ভাবনাটা সহ্য হচ্ছিল না।”
গত কয়েক মাস ধরে কর্মীরা ব্যস্ত ছিলেন কেন্দ্রের বিশাল প্রদর্শনী সামগ্রী, বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ও সংরক্ষিত নিদর্শনগুলো প্যাকিং ও স্থানান্তরের কাজে। শতাধিক ট্রাকভর্তি প্রদর্শনী সামগ্রী পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন সংরক্ষণাগারে। কিন্তু সব কিছুই সরানো যায়নি—অনেক নাজুক ও অচল স্থাপনা থেকে গেছে ভবনের ভেতরে। কর্মীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন “সবকিছু কি একদিন আবার ফিরবে?”
গত জুনের শেষ দিকে অন্টারিও প্রাদেশিক সরকার আকস্মিকভাবে ঘোষণা দেয় ভবনের ছাদের কাঠামোগত ত্রুটি ধরা পড়ায় অন্টারিও সায়েন্স সেন্টার স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে। সরকারের যুক্তি ভবনটি মেরামত অযোগ্য, এবং নিরাপত্তার স্বার্থে এটি বন্ধ রাখা জরুরি।
কিন্তু অনেকেই এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট নন। সমালোচকরা মনে করেন, সিদ্ধান্তটি কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ও আর্থিক হিসাব। সংস্কারের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২৫ কোটি ডলার। ফলে কেউ কেউ বলছেন, সরকার চাইছে ভবিষ্যতে অন্য স্থানে একটি নতুন সায়েন্স সেন্টার গড়ে তুলতে কিন্তু সেই প্রক্রিয়া এখনও অনিশ্চিত ও ধীরগতি।
একজন সাবেক কর্মকর্তা বাংলামেইলকে বলেন, “একটি ভবন মেরামত করা যায়, কিন্তু এর মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে ফিরিয়ে আনা যায় না। অন্টারিও সায়েন্স সেন্টার শুধু ইট-কাঠের স্থাপনা নয়, এটি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বিজ্ঞানচেতনা শিখিয়েছে।”
মিডলি ডানফি সেদিন ঘুরে দেখেছিলেন তার প্রিয় স্থানগুলো। বিশেষ করে রেইনফরেস্ট যেখানে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছিল এক জীবন্ত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অরণ্য।
“আমি প্রায়ই এখানে আসতাম,” বলেন তিনি। “ভেজা মাটির গন্ধ আমাকে শান্তি দিত। এখন গাছ নেই, প্রাণীগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তবু সেই গন্ধটা এখনও টিকে আছে। কিন্তু আগের মতো আর লাগে না যেন যাদু হারিয়ে গেছে।”
রেইনফরেস্টে আগে ছিল কচ্ছপ, সাপ, রঙিন মাছ, আর বিষাক্ত ব্যাঙের মতো প্রাণী। সেগুলো পাঠানো হয়েছে নতুন আশ্রয়ে। অধিকাংশ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে এবং কিছু প্রতিস্থাপন করা হয়েছে টরন্টো চিড়িয়াখানায়। তবুও পাঁচটি বিশালাকার গাছ এখনও ভবনের ভেতরে জীবিত আছে তাদের বাঁচিয়ে রাখছে স্বয়ংক্রিয় সেচ ও তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
ফিশার, একজন সিনিয়র গবেষক, যিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কেন্দ্রটিতে কাজ করেছেন, বললেন, ৩১ অক্টোবর ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন। সুইজারল্যান্ডের একটি সায়েন্স সেন্টার থেকে কানাডায় আসার পর তিনি কেবল একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছিলেন অন্টারিও সায়েন্স সেন্টারে। আগামী মাসে তার কর্মজীবনের ২৫ বছর পূর্ণ হতো।
“এই জায়গাটা আমার জীবনের অংশ ছিল,” বলেন ফিশার। “আমরা শুধু বিজ্ঞান শেখাতাম না, আমরা শেখাতাম কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়। শিশুরা এখানে প্রথম জানত কেন আকাশ নীল, কেন তারা জ্বলে, কেন পৃথিবী ঘোরে। এখন সেই স্থানটি নেই, যেন এক ইতিহাস হারিয়ে গেল।”
১৯৬৯ সালে উদ্বোধনের পর থেকে অন্টারিও সায়েন্স সেন্টার কানাডার বিজ্ঞান শিক্ষা ও উদ্ভাবনের প্রতীক হিসেবে গড়ে উঠেছিল। প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ দর্শনার্থী আসতেন এখানে শিক্ষার্থী, পরিবার, গবেষক, এমনকি বিদেশি পর্যটকরাও। ৫০০-রও বেশি ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রদর্শনী ছিল, যেখানে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পেত শিশুরা।
এমন একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া শুধু টরন্টো নয়, বরং কানাডার বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসের এক গভীর ক্ষতি। তবে আশার আলো দেখেন অনেকেই। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে একটি নতুন সায়েন্স সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে, যদিও এখনো তা প্রাথমিক পর্যায়ে।
যখন সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ছে, এমা মিডলি ডানফি দাঁড়িয়ে ছিলেন ভবনের বাইরে। চোখে জল, ঠোঁটে একটুখানি হাসি। তিনি বলেন, “আমরা সবাই জানি, একদিন বিজ্ঞান আবার ফিরবে নতুন রূপে, নতুন স্থানে। কিন্তু এই জায়গার অনুভূতি, এই ঘ্রাণ, এই স্মৃতি কোনো কৃত্রিম ভবনে পাওয়া যাবে না।”
অন্টারিও সায়েন্স সেন্টারের দরজা হয়তো বন্ধ হয়েছে, কিন্তু এর গল্প, প্রেরণা আর কৌতূহলের আগুন বেঁচে থাকবে হাজারো মানুষের হৃদয়ে। কারণ, এই কেন্দ্র ছিল শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয় এটি ছিল শেখার, বেড়ে ওঠার, এবং কল্পনাকে ডানা মেলার এক আশ্রয়স্থল।

