
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। একদিকে হিমবাহ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, অন্যদিকে তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। এই বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা একবাক্যে দায় দিচ্ছেন শিল্পোন্নত দেশগুলোর অতীত ও বর্তমান কার্বন নিঃসরণকে। ফলে প্রশ্ন উঠছে এই দেশগুলো, বিশেষত কানাডার মতো ধনী ও উচ্চ-কার্বন নির্ভর রাষ্ট্রগুলো, বৈশ্বিক জলবায়ু ক্ষতির দায় কতটা নেবে?
আসন্ন জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৯ এ বছর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে “জলবায়ু অর্থায়ন” বা climate finance অর্থাৎ, উন্নত দেশগুলো কীভাবে এবং কতটা অর্থ সহায়তা দেবে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বৈঠকে নতুন আর্থিক প্রতিশ্রুতি না এলে কিয়োটো প্রটোকল বা প্যারিস চুক্তির মতো আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তিগুলোর প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। এমনটি ঘটলে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমায় বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাও বড় ধাক্কা খাবে।
পরিবেশ বিজ্ঞানী জনার্থন শিবা বাংলামেইলকে বলেন, “এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়। উন্নত দেশগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করে শিল্পোন্নয়ন করেছে। কিন্তু সেই উন্নয়নের খেসারত এখন দিচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। তাই এই দায়বদ্ধতা থেকে সরে আসা মানে জলবায়ু ন্যায্যতাকে অস্বীকার করা।”
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (UNFCCC) অনুযায়ী, যে দেশগুলো শিল্পবিপ্লবের পর থেকে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করেছে, তাদেরই এখন বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি আর্থিক অবদান রাখতে হবে।
পরিসংখ্যান বলছে কানাডা এবং আরও ২২টি উন্নত দেশ গত দেড় শতাব্দীতে বৈশ্বিক মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় অর্ধেকের জন্য দায়ী। অথচ এই দেশগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা বিশ্বের মাত্র ১২ শতাংশ। মাথাপিছু হিসাবে কানাডা এখনো বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোও একই তালিকায় রয়েছে।
২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত কপ-১৫ সম্মেলনে ধনী দেশগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা ২০২০ সালের মধ্যে প্রতি বছর কমপক্ষে ১০০ বিলিয়ন ডলার তহবিল গঠন করবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু অভিযোজন, পুনর্বাসন ও সবুজ প্রযুক্তি বিনিয়োগে সহায়তার জন্য।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। বিভিন্ন স্বাধীন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশগুলো অন্তত দুই বছর পিছিয়ে পড়েছে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে।
কানাডা দাবি করছে, তারা ইতিমধ্যে ৫.৩ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে জলবায়ু অর্থায়নে। কিন্তু পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, সেই অর্থের বড় অংশই ঋণ আকারে, সরাসরি অনুদান নয় ফলে তা “সহায়তা” নয় বরং “দায় ঠেলাঠেলি”।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর বর্তমান চাহিদার তুলনায় বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন অন্তত চারগুণ কম। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশগুলো প্রতিবছর জলবায়ু বিপর্যয়ে শত শত কোটি ডলার ক্ষতির মুখে পড়ছে। অথচ প্রতিশ্রুত সহায়তার সামান্য অংশই তারা হাতে পাচ্ছে।
একজন কানাডীয় জলবায়ু নীতি বিশ্লেষক বাংলামেইলকে বলেন, “কানাডা পৃথিবীর অন্যতম ধনী ও প্রযুক্তিসম্পন্ন দেশ। তারা চাইলে জলবায়ু অর্থায়নে নেতৃত্ব দিতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং অভ্যন্তরীণ স্বার্থরাজনীতি এই নেতৃত্বের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।”
কানাডা সরকার জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে ৫.৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে। এই অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব কৃষি, নারী নেতৃত্বাধীন জলবায়ু প্রকল্প এবং দুর্যোগ প্রতিরোধমূলক উদ্যোগে ব্যবহার হবে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অর্থ বিশ্বব্যাপী প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য এবং জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বাস্তব চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয়।
জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর বছরে অন্তত ৬০০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন জলবায়ু অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায়। সে তুলনায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য এখন অবাস্তব ও অপ্রতুল। বিশেষ করে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা হুমকি, এবং জলবায়ু উদ্বাস্তু সংকটের মতো সমস্যাগুলোর পরিধি বিবেচনায় নিলে, বর্তমান তহবিল ব্যবস্থা প্রায় “প্রতীকী” হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের দায় এখন আর শুধু বিজ্ঞান বা পরিবেশের প্রশ্ন নয় এটি ন্যায্যতার প্রশ্ন। কানাডা ও অন্যান্য উন্নত দেশের কাছে এখন সময় এসেছে সেই “জলবায়ুর ঋণ” পরিশোধের।
কারণ, জলবায়ুর এই দায় শুধু টাকার নয় এটি নৈতিক ও মানবিক দায়বদ্ধতা।
শেষ পর্যন্ত, যদি ধনী দেশগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তাহলে কেবল পৃথিবীর দরিদ্র জনগোষ্ঠী নয়, বরং গোটা মানবসভ্যতাই এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে যেখানে জলবায়ু আর ভবিষ্যতের হুমকি নয়, বর্তমানের বাস্তবতা।

