
কানাডার টরন্টো ও আশপাশের অঞ্চলে সাম্প্রতিক শিখ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংসতা ও উত্তেজনার প্রেক্ষিতে ভারতের টরন্টো কনস্যুলেট বেশ কয়েকটি নির্ধারিত কূটনৈতিক কার্যক্রম এবং সাইট ভিজিট সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে। কনস্যুলেটের এই সিদ্ধান্ত শুধু নিরাপত্তা উদ্বেগ নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনেরও একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গত রোববার (৫ অক্টোবর) অন্টারিও প্রদেশের ব্র্যাম্পটনে অবস্থিত হিন্দু সভা মন্দিরের সামনে শুরু হয় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি, যা মুহূর্তেই সহিংসতায় রূপ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, উভয় পক্ষের লোকজনের হাতে ছিল লাঠি, কাঠের টুকরা, এমনকি ধাতব দণ্ডও। সংঘর্ষের সময় স্লোগান, হামলা এবং পাল্টা হামলার ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ব্র্যাম্পটন পুলিশ জানায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তাদের প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে। পরে, ঘটনাস্থলে পুলিশ ব্যাপক সংখ্যায় মোতায়েন করা হয় এবং মন্দিরের চারপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পরদিনও একই স্থানে কিছু মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করলে পুলিশ ‘অবৈধ সমাবেশ’ ঘোষণা করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, এই সংঘর্ষের মূল পটভূমিতে রয়েছে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ও প্রবাসী হিন্দু সংগঠনগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান মুখোমুখি অবস্থান।

শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা অভিযোগ করেছেন, ভারতের টরন্টো কনস্যুলেটের কিছু কর্মকর্তা স্থানীয় মন্দির ও উপাসনালয়ে গিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তাদের দাবি এই সফরের মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কানাডায় অবস্থানরত খালিস্তান সমর্থক শিখদের শনাক্তের চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, ভারতীয় সম্প্রদায়ের একাংশ বলছেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের মতে, খালিস্তানপন্থী গোষ্ঠীগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা করছে।
টরন্টো কনস্যুলেট এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্থানীয় নিরাপত্তা সংস্থার কাছ থেকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা না পাওয়ায় কিছু নির্ধারিত কনস্যুলার ক্যাম্প ও সাইট ভিজিট স্থগিত করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “আমরা স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়াটাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে আমাদের সব সেবা পুনরায় চালু করা হবে।”
কনস্যুলেটের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, স্থগিত হওয়া সাইট ভিজিটগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্র্যাম্পটন, মিসিসোগা, হ্যালিফ্যাক্স, উইন্ডসর এবং লন্ডন শহর। তবে কবে থেকে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হবে তা এখনো জানানো হয়নি।
গত মাসেই কানাডা সরকার ছয়জন ভারতীয় কূটনীতিককে বহিষ্কার করে, যাদের বিরুদ্ধে অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে নাম প্রকাশ করা হয়নি, সরকারি নথি অনুযায়ী অটোয়া ও টরন্টো মিশনের কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা যেমন ফার্স্ট সেক্রেটারি বিক্রম সিং ভাট্টি, টরন্টোর কর্মকর্তা ধীরাজ পারিক, এবং ভ্যানকুভারের রাহুল নেগির নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এই বহিষ্কার পর্বের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে। ভারত সরকার বিষয়টিকে “অন্যায় কূটনৈতিক পদক্ষেপ” বলে অভিহিত করেছে, অন্যদিকে কানাডা বলছে “জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষায় এটি জরুরি সিদ্ধান্ত।”
খালিস্তানপন্থী ভারতীয়-কানাডিয়ান মানদিপ সিং বাংলামেইলকে বলেন, “আমাদের আন্দোলন কোনোভাবেই দমন করা যাবে না। স্বাধীন মাতৃভূমির দাবিতে আমরা আজীবন লড়ে যাবো।” তার এই বক্তব্য আবারো ইঙ্গিত দেয় যে, কানাডার মাটিতে ভারতীয় রাজনীতির প্রভাব ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, টরন্টো, ব্র্যাম্পটন ও সারে এই তিন শহরে দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত জনসংখ্যা অত্যন্ত ঘন। অতীতে এই সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ভারসাম্য নষ্ট করছে।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. অমিতাভ কৌর বলেন, “এটি কেবল ধর্মীয় সংঘাত নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন কানাডার সমাজ কাঠামোকেও প্রভাবিত করছে।”
এ মুহূর্তে টরন্টো, ব্র্যাম্পটন ও মিসিসোগায় পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। মন্দির, গুরুদ্বার এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।
ভারতীয় কনস্যুলেট জানিয়েছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে তাদের নিয়মিত কূটনৈতিক ও কনস্যুলার কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হবে। অন্যদিকে, কানাডার ফেডারেল সরকার ঘোষণা করেছে, “ঘৃণামূলক বক্তব্য বা সহিংসতার কোনো স্থান কানাডায় নেই।”
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে দুই দেশের মধ্যে আস্থার সঙ্কট আরও গভীর হতে পারে, যা বাণিজ্য, ভিসা নীতি ও অভিবাসন প্রক্রিয়াতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারত-কানাডা সম্পর্ক ইতিমধ্যেই সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কূটনৈতিক বহিষ্কার, প্রবাসী রাজনীতির প্রভাব, এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক সহিংসতা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। টরন্টোর ঘটনার পর কনস্যুলেটের কার্যক্রম স্থগিত হওয়া এই উত্তেজনাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। দুই দেশের সরকার যদি এখন সংলাপ ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের পথে না হাঁটে, তবে এই টানাপোড়েন দক্ষিণ এশীয় প্রবাসী সমাজের ঐক্যকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

