
বিশ্বব্যাপী মহামারির আতঙ্ক ধীরে ধীরে কমলেও কোভিড-১৯ এখনো সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়নি। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, করোনা ভাইরাসটি এখন “এন্ডেমিক” বা স্থানীয়ভাবে স্থায়ীভাবে আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে, যা প্রতি বছরই নতুন সাব-ভ্যারিয়েন্টের মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম। তাই, চিকিৎসকরা বার্ষিক ফ্লু টিকার সঙ্গে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনকেও নিয়মিত নেওয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দিচ্ছেন।
কানাডার সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আইজ্যাক বোগোশ বাংলামেইলকে বলেন, “কোভিড এখন আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। এটি কোনো মৌসুমি রোগ নয় বরং সারা বছরই ছড়ায়, যদিও শরৎ ও শীতকাল সংক্রমণের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। তাই ফ্লু শটের সময় কোভিডের নতুন ডোজ নেওয়াই সবচেয়ে যৌক্তিক।”
কোভিড ভাইরাসের সবচেয়ে জটিল দিক হলো এর ক্রমাগত মিউটেশন। প্রতি কয়েক মাসে নতুন সাব-ভ্যারিয়েন্ট তৈরি হয়, যা আগের সংক্রমণ বা টিকার সুরক্ষা ভেদ করে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। শিশু ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আন্না ব্যানার্জি বলেন, “ভাইরাস ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই আমাদের নিয়মিতভাবে ভ্যাকসিন হালনাগাদ করতে হবে, যাতে আমরা প্রচলিত ধরনগুলোর বিরুদ্ধে সুরক্ষিত থাকতে পারি।”
বর্তমানে কানাডায় যে নতুন কোভিড ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে, তা ওমিক্রন সাব-ভ্যারিয়েন্ট এক্সবিবি ১.৫-এর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রমাণিত। এই ধরনটি ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে ছড়িয়ে পড়ে। বছরের শেষের দিকে আরও দুটি নতুন ভ্যারিয়েন্ট কেপি.২ ও জেএন.১ এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
ফেডারেল স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত তিনটি প্রধান ভ্যাকসিন অনুমোদিত হয়েছে, যা নতুন ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে সক্ষম। এগুলো হলো ফাইজার-বায়োএনটেকের ‘কমিরন্যাটি’, মডার্নার ‘স্পাইকভ্যাক্স’, নোভাভ্যাক্সের ‘নুভাক্সোভিড’।
ডা. ব্যানার্জি জানান, “নতুন ভ্যারিয়েন্ট আসা এবং নতুন ভ্যাকসিন তৈরি হওয়ার মধ্যে সবসময় সময়ের ফারাক থাকে। প্রতিটি ভ্যাকসিনের পরীক্ষা, অনুমোদন এবং উৎপাদনের প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। তাই নিয়মিত আপডেট থাকা অত্যন্ত জরুরি।”
ফাইজার-বায়োএনটেক ও মডার্নার ভ্যাকসিন দুটি mRNA প্রযুক্তিভিত্তিক, যা শরীরকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, নোভাভ্যাক্সের ভ্যাকসিনটি প্রোটিন-ভিত্তিক, যা তুলনামূলকভাবে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে তৈরি। বয়সভেদে টিকার ব্যবহারও আলাদা – মডার্নার স্পাইকভ্যাক্স ৬ মাস ও তার বেশি বয়সীদের জন্য অনুমোদিত এবং ফাইজার-বায়োএনটেকের কমিরন্যাটি এবং নোভাভ্যাক্স নুভাক্সোভিড ১২ বছর ও তার বেশি বয়সীদের দেওয়া যায়।
ডা. বোগোশের মতে, “কোন কোম্পানির ভ্যাকসিন নেওয়া হয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয় প্রধান বিষয় হলো সর্বশেষ অনুমোদিত ডোজ নেওয়া হয়েছে কি না। সহজলভ্য ভ্যাকসিনই নেওয়া উচিত।”
বাংলামেইলের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কানাডায় ফ্লু ও কোভিড যৌথ টিকা গ্রহণকারীর সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, এই সমন্বিত টিকাদান ভবিষ্যতে মৌসুমি সংক্রমণ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, কোভিড এখন আর আতঙ্কের কারণ নয়। তবে এটিকে অবহেলা করাও বিপজ্জনক। ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিক পর্যন্ত, দেশের হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ১৭ শতাংশের বেশি কোভিড সংক্রমণ-সম্পর্কিত ছিল।
ডা. ব্যানার্জি বলেন, “ফ্লুর মতোই কোভিডের সঙ্গেও বাঁচতে শিখছি। কিন্তু এই সহাবস্থানের জন্য প্রস্তুত থাকা জরুরি এবং টিকা হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বার্ষিক ফ্লু শটের মতো কোভিড ভ্যাকসিনকেও নিয়মিত স্বাস্থ্যচর্চার অংশ হিসেবে দেখা উচিত, কারণ এটি শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো সমাজকেই সুরক্ষিত রাখে।

