
টরন্টো, কানাডার অন্যতম ব্যস্ত নগরী। শহরটির রাস্তা, বিশেষত ডাউনটাউন এলাকার মোড়গুলো, প্রতিদিন সকাল ও বিকেলের রাশ আওয়ারে যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। অফিসগামী, গণপরিবহন, ট্যাক্সি, ডেলিভারি ভ্যান সব মিলিয়ে যানবাহনের চাপ এতটাই বেড়েছে যে, অনেক সময় শহরের কেন্দ্রস্থল সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাফিক বিশ্লেষকরা যে নতুন বিপদের কথা বলছেন, তা হলো—‘বক্স ব্লকিং’।
‘বক্স ব্লকিং’ বলতে বোঝানো হয় এমন পরিস্থিতি, যখন কোনো চালক সবুজ বাতিতে মোড়ে প্রবেশ করেন, কিন্তু সামনে জায়গা না থাকায় সম্পূর্ণ অতিক্রম করতে পারেন না। ফলে সিগন্যাল লাল হয়ে গেলে গাড়িটি মোড়ের মাঝখানেই আটকে থাকে, আর অন্য দিকের যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
এই একটিমাত্র ভুল সিদ্ধান্তের ফলেই তৈরি হয় চেইন রিঅ্যাকশন একটির পর একটি গাড়ি আটকে গিয়ে পুরো এলাকার যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। অনেক সময় এতে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার ট্রাক কিংবা পুলিশ ভ্যানের মতো জরুরি যানও বিপাকে পড়ে।
বাংলামেইলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টরন্টো পুলিশ সার্ভিস (TPS)-এর অফিসার প্যাট্রিক রেমন্ড বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শহরকে সচল রাখা। কিন্তু প্রতিদিন আমরা দেখি, অনেক চালক জেনেশুনেই মোড়ের মাঝখানে গাড়ি থামাচ্ছেন। এতে শুধু নিয়ম ভঙ্গ হয় না, বরং পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “অনেক চালক দাবি করেন, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে নয় পরিস্থিতির কারণে আটকে যান। কিন্তু নিয়ম সবার জন্য সমান। লাল আলো জ্বলার পর যদি গাড়ি মোড়ে আটকে থাকে, তাহলে সেটি অপরাধ, আর জরিমানাও দিতে হবে।”
এই বাড়তে থাকা বিশৃঙ্খলা রোধে চলতি বছরের শুরুতে টরন্টো সিটি কাউন্সিল একটি প্রস্তাব পাস করেছে। সেখানে অন্টারিও প্রাদেশিক সরকারকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, মোড়ে নিয়মভঙ্গের জন্য জরিমানার পরিমাণ বাড়াতে।
বর্তমানে ‘বক্স ব্লকিং’-এর জন্য জরিমানা ৮৫ ডলার, যা বাড়িয়ে ৪৫০ ডলার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া স্কুল, হাসপাতালসহ কমিউনিটি সেফটি জোনে এই জরিমানা ১২০ ডলার থেকে ৫০০ ডলার পর্যন্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
টরন্টো ট্রান্সপোর্টেশন সার্ভিসেস-এর তথ্য অনুযায়ী, শহরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০০টি মোড়ে ট্রাফিক বাধার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে অন্তত এক-তৃতীয়াংশই ‘বক্স ব্লকিং’-এর কারণে। ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়াররা বলছেন, টরন্টোর ডাউনটাউন এলাকা এমনিতেই সরু রাস্তা ও ঘনবসতিপূর্ণ। গাড়ির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, সেই সঙ্গে সাইক্লিস্ট ও পথচারীর সংখ্যাও বেড়েছে। ফলে মোড়ের জায়গাগুলোতে চাপ তৈরি হচ্ছে বহুগুণে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জরিমানা বাড়িয়ে এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিগত নজরদারি ও চালকদের আচরণগত পরিবর্তন। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ইতিমধ্যেই বসানো হচ্ছে “রেড লাইট ক্যামেরা” ও “ইন্টারসেকশন মনিটরিং সিস্টেম”, যা নিয়মভঙ্গকারী চালকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে জরিমানা পাঠাবে।
টরন্টো সিটি কাউন্সিলর নিকোলাস জনসন বলেন, “শহরের প্রতিটি সড়ক সচল রাখা আমাদের অগ্রাধিকার। কিন্তু আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি। এক চালকের ভুল সিদ্ধান্ত পুরো শহরের ট্রাফিক থামিয়ে দিতে পারে এটা সবাইকে বুঝতে হবে।”
বর্তমানে টরন্টোর বিভিন্ন মোড়ে বড় বড় হরফে লেখা দেখা যাচ্ছে “Don’t Block the Box”। তবু অনেকে তা উপেক্ষা করে চলেছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিগগিরই শুরু হবে বিশেষ অভিযান, এবং কোনো ধরনের ছাড় বা ব্যতিক্রম থাকবে না।
সব মিলিয়ে, টরন্টোর যানজট এখন এক গভীর সংকটে। প্রশাসন আইন কঠোর করছে, ক্যামেরা বসাচ্ছে, জনসচেতনতা বাড়ানোর প্রচারণা চালাচ্ছে তবুও শেষ পর্যন্ত শহর সচল রাখার দায় নাগরিকদেরই। একটি গাড়ি ভুল জায়গায় থেমে গেলে পুরো শহর থেমে যায় এই সত্য যদি প্রতিটি চালক উপলব্ধি করেন, তবেই হয়তো টরন্টো আবার ফিরে পাবে তার স্বাভাবিক ছন্দ।

