
গতবছর যখন আমরা এসবিসিএ এর উদ্যোগে উদযাপন করেছিলাম আমাদের প্রথম দুর্গা পূজা, তখন মনের কোনে জেগে উঠেছিল এক ক্ষীণ আশা – হয়তো একদিন আমরা মাকে পাবো মৃন্ময়ী রুপে। সেদিন যে এতো কাছে তা আমরা কেউ বুঝতে পারিনি ! আমাদের প্রত্যাশাকে পূরণ করতে এগিয়ে এলেন অসংখ্য উৎসাহী প্রাণ, যারা আমাদের দীনতা দিলেন ঘুচিয়ে; তারা সবাই তাদের ভাণ্ড দিলেন খুলে, আমরা পৌঁছে গেলাম স্বপ্ন পূরণের কাছাকাছি। ঠিক হল আমরা কুমারটুলি থেকে মাকে নিয়ে আসবো কানাডার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিকাশমান আমাদের এই সমৃদ্ধ অঞ্চল ওয়াটারলুতে। কর্মব্যস্ত জীবনের কাছ থেকে সময় বের করে আমাদেরই কিছু নিবেদিত প্রাণের নিরলস প্রচেষ্টায় একদিন ঘোষণা এলো – মা আসছেন আর তার সাথে রয়েছেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্ত্তিক, গণেশ, ও মহিষাসুর। আমরা আনন্দে উদ্বেলিত হলেম।
অবশেষে সমস্ত প্রতীক্ষার যবনিকা টেনে মা যাত্রা করলেন কলিকাতা বন্দর থেকে; সাত সমুদ্র পারি দিয়ে এলেন কানাডার হ্যালিফ্যাক্সে, অতঃপর টরন্টো হয়ে আমাদের ওয়াটারলুতে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলেম দুদিন ব্যাপী দুর্গোৎসব উৎযাপন করবো, কিন্তু এর জন্য যে দরকার বিশাল বাজেট ! আমরা হাত পাতলেম । আমাদের হাতকে কেউই ফিরিয়ে দিলেন না। এ কর্মকাণ্ডকে সফলতার মুখ দেখাতে এসবিসিএ – এর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এগিয়ে এলেন রিয়ালটর সোহম দাস, রিয়ালটর ইন্দ্রনীল ঘোষ, রিয়ালটর রূপক নন্দন, রিয়ালটর বৈষ্ণবী কালসি, মর্টগেজ এজেন্ট সুদীপ্ত ভট্টাচার্য, ব্যারিস্টার সূর্য চক্রবর্ত্তী, এবং ওয়াটারলু এর সিপিসি নোমিনেশন ক্যান্ডিডেট মায়াঙ্ক প্যাটেল I
স্পনসর হিসেবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন ইন্ডিয়ান সুপারমার্কেট, ইন্ডিয়ান ফুড এবং গ্রোসারি, সারদা ফ্যাশন এবং জুয়েলারি, স্থানীয় রেস্তোরাঁ জায়ালক্ষ্মী সাউথ ইন্ডিয়ান কুইসিন, এবং মাছে ভাতে বাঙালি I আর্থিক অনুদান দিয়ে সমর্থন করেছেন আশুতোষ রায় চৌধুরী, মা ট্যাক্স ইনকরপোরেশন, রিয়ালটর দেবদূত দাস, রিয়ালটর সুকুমল রায়, পিজা ডিপো ওয়াটারলু, বাহারি এবং ঘরোয়া বাঙালি খাবারের প্রতিষ্টান অর্পিতা’স কিচেন, রামকিস্সুন মিউজিক স্টোর, এবং মর্টগেজ এজেন্ট কপিল শর্মা। আমরা তাদের উদারতার কাছে আন্তরিক ভাবে কৃতজ্ঞ। আমরা আরও কৃতজ্ঞ আমাদের ওয়াটারলু শহরের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও মাননীয় এমপিপি বারদীস চ্যাগার, কিচেনার শহরের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও এমপিপি মাইক মরিসের প্রতি, যাদের অকুণ্ঠ সমর্থনে এসবিসিএ এর প্রতিটি কর্মী উৎসাহিত বোধ করেছে।
এসবিসিএ এর যে প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ না করলেই নয়, তা হল টিম ওয়ার্ক। যখন সুদূর ভারতের কলিকাতা থেকে একদল কর্মী মায়ের পাঁচ চালা প্রতিমা আর তার সাথে মা কালীর মূর্তি নিরাপদে ওয়াটারলু পর্যন্ত আনতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, তখন অপর প্রান্তে বিশাল এক কর্মী বাহিনী খন্ড খণ্ড অংশে বিভক্ত হয়ে কেউ নিয়েছে অভ্যাগত অতিথিদের বরণ করে নিতে; কেউ নিয়েছে সহস্রাধিক দর্শনার্থীর হাতে পূজার প্রসাদ পৌঁছে দিতে; কেউ নিয়েছে পুরোহিতের সাথে হাতে হাত রেখে মায়ের ভোগের ব্যবস্থা করতে; কেউ নিয়েছে সাজসজ্জা সহ লজিস্টিক সহযোগিতা করার গুরু দায়িত্ব; আবার কেউ নিয়েছে একটা সুন্দর মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপহার দেবার জন্য পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় অনুশীলন, উদ্বুদ্ধকরণ, আর যোগাযোগের দায়িত্ব।
শুধু তাই নয়, এর বাইরেও পর্দার অন্তরালে কতজন যে কতো ভাবে কাজ করে গেছে, যার হিসেব রাখা সত্যি দুরূহ কর্ম ! গতবারের মতো এবারো অসংখ্য কলাকুশলীদের উচ্ছ্বসিত অংশগ্রহণে জমে উঠেছিল আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সদ্য বোল ফুটা ছোট ছোট শিশু থেকে আরম্ভ করে, কিশোর কিশোরীসহ পরিণত বয়সের শিল্পীদের আবৃত্তি, নৃত্য, সঙ্গীত, শ্রুতি নাটক, নব দূর্গা থিম সো , দূর্গা টক্ শো আর স্বনাম ধন্য শিল্পী পৌলমী নন্দন ও চন্দন পালের মনোজ্ঞ সঙ্গীত পরিবেশনা আমাদের পূজার আনন্দকে অনেক গুনে বর্ধিত করেছে। তাছাড়া অনুষ্ঠানের অনুষঙ্গ হিসেবে ধুনুচি খেলা, সিঁদুর খেলা, শঙ্খ ফু্, ঢাক বাজানো প্রতিযোগিতা এবং ছোটদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো । এতদঞ্চলের ক্রমবর্ধমান হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রাণের দাবী নিয়ে এসবিসিএ এর পাশাপাশি এবছর আত্মপ্রকাশ করেছে আরেকটি সংগঠন ।
আজ আমরা পারস্পরিক সৌহার্দ্য আর সহযোগিতার মেলবন্ধনে পূজার এই আনন্দকে এক মহান মিলন মেলাতে পরিণত করেছি। দুদিন ব্যাপী এই পূজার অনুষ্ঠানে আমাদের এ পাড়ার মানুষ ও পাড়ায় গিয়েছেন পূজা দেখতে, আর ও পাড়ার মানুষ এ পাড়ায়। একদা এ অঞ্চলের যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের টরন্টো, মিসিসাগাসহ দূরবর্তী অঞ্চলে যাওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর ছিল না, তারা আজ সুযোগ পেয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন দিনে তিন তিনটি পূজাতে অংশগ্রহণ করতে। আমরা সবার অবদানকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি। আজ প্রত্যাশা করতে সাধ হয় – যারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন,, ভবিষ্যতেও তেমনি করে তারা বাড়িয়ে দিবেন তাদের সাহায্য সহযোগিতার হাত, বিশেষ করে এতদঞ্চলে একটা মন্দির প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন সাকার করতে। কে জানে হয়তো সেদিন খুব দূরে নয় !
বি.দ্র. আগামী ১ নভেম্বর ওয়াটারলু অঞ্চলে এসবিসিএ আয়োজন করতে যাচ্ছে মৃন্ময়ী রূপে প্রথমবারের মতো শ্যামা কালী পূজা। আমাদের এই উদ্যোগ বাঙালি সম্প্রদায়কে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দেয়, কারণ আমরা পরাক্রমশালী দেবী, মা কালীকে ভালবাসা এবং শ্রদ্ধার সাথে সম্মান করি। এমন এক মহতী অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্য সাউথ ওয়েস্টার্ন অন্টারিও এর হিন্দু ধর্মাবলম্বী সকল ভক্তদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

