
বরেণ্য কবি ও খেলাঘর কানাডা’র ভাইয়া কবি আসাদ চৌধুরী’র প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় টরন্টোর বাংলাদেশ সেন্টার অ্যান্ড কমিউনিটি সার্ভিস (বাংলাদেশ সেন্টার) মিলনায়তনে ‘তুমি রবে নিরবে’ শীর্ষক এক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, নাট্যকর্মী, সমাজকর্মী, রাজনীতিবিদ সর্বস্তরের মানুষের উপচেপড়া সমাগমে আর কবি পরিবারের উপস্থিতিতে কবি’র প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা, আবেগ আর ভালবাসায় এক অনন্য আয়োজনে পরিণত হয় খেলাঘরের এই অনাড়ম্বর স্মরণসভাটি।
খেলাঘর আয়োজিত সভায় শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন কবির অনুরাগীবৃন্দ। কবিকে নিবেদিত কবিতা পাঠ ও কবির কবিতা আবৃত্তি করা হয় এবং সংগীতের মাধ্যমেও তাঁকে স্মরণ করা হয়।
আলোচকবৃন্দ বলেন, কবি আসাদ চৌধুরী’র বুকজুড়ে ছিল বাংলাদেশ, একাত্তর আর মহান মুক্তিযুদ্ধ। তিনি তাঁর প্রিয় স্বদেশকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতেন। আর তাই প্রশ্ন করেছিলেন,’তোমাদের যা বলার ছিল, বলছে কি তা বাংলাদেশ?’ তাঁরা বলেন, আজকের বাস্তবতায় তাঁর ওই আক্ষেপের ধ্বনি আরও বেশী অনুরণিত হয় মানুষের গহিনে গহিনে।
সংস্কৃতিকর্মী ও শিল্পী শিখা আখতারি আহমেদ ও আরিয়ান হক-এর যৌথ পরিবেশনায় ‘এই সমাধিতলে কত প্রাণ-প্রদীপ জ্বলে’ সঙ্গীতের সাথে কবির প্রতিকৃতিতে প্রদীপ জ্বালিয়ে ও ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে শুরু হয় এই আয়োজন। অতঃপর কবি আসাদ চৌধুরী, সাম্প্রতিক সময়ে পরকালে পাড়ি দেয়া কমিউনিটির প্রিয়মুখ ব্যারিস্টার রিজোয়ান রহমান, প্রয়াত রেখা হাবিবুল্লাহ এবং অতি সম্প্রতি হারিয়ে যাওয়া সকলের স্মরণে ও শ্রদ্ধায় দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
খেলাঘর কানাডা’র প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক জামিল বিন খলিলের সঞ্চালনায় স্মরণসভার প্রারম্ভিক বক্তব্যে খেলাঘর কানাডা’র অভিভাবক, লেখক, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্মী হাসান মাহমুদ বলেন, ‘রাজার মতন ছিলেন আসাদ চৌধুরী, কিন্তু কাউকে প্রজার মতন ভাবেননি। হিমালয়ের উচ্চতা ছিল তাঁর, কিন্তু কাউকে কখনও ছোটো ভাবেননি’।
‘আসাদ চৌধুরী বুকের গভীর থেকে বাংলাদেশকে চিনতেন’ উল্লেখ করে স্বনামধন্য সংবাদ পাঠিকা আসমা আহমদ মাসুদ বলেন, আমি সিলেটের মেয়ে হয়েও সিলেটকে তাঁর মতো এতটা চিনি না। তিনি কতকিছু জানতেন। গুড মুড নিয়ে কথা বলতেন। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্ম রয়ে গেছে।
কবির সাথে বিভিন্ন টুকরো টুকরো স্মৃতি তুলে ধরে প্রখ্যাত গীটার শিল্পী এনামুল কবির কবি আসাদ চৌধুরীকে একজন শুদ্ধ আলোকিত মানুষ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল বলেন, বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র কাব্যভাষা আসাদ চৌধুরী নির্মাণ করেছেন। নিজস্বতা অর্জন করেছেন। তাঁকে মানুষ শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে যুগ যুগ ধরে। তিনি অনুষ্ঠানে বৃটিশ কলম্বিয়ার ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্স অব দ্যা ওয়া্রল্ড সোসাইটি’ প্রদত্ত স্মারক সন্মাননা সংগঠনের পক্ষ থেকে কবি আসাদ চৌধুরীর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন। তাঁর পাশে ছিলেন কবিপুত্র আসিফ চৌধুরী ও কন্যা নুসরাত জাহান চৌধুরী শাঁওলিসহ পরিবারের সদস্যরা।
বাংলা একাডেমি পুরষ্কারপ্রাপ্ত লেখক সালমা বাণী বলেন, কবিকে দেখেছিলাম তবক দিয়ে পান খেতে। কাঁধব্যাগে উঁকি দিচ্ছিল বই। আমার বইয়ের বিচারকও ছিলেন তিনি। জেমকন সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত আমার উপন্যাস ‘ইমিগ্রেশন’ পড়ে বলেছিলেন, আমি একশতে একশত নম্বর দিলাম। তাঁর কথায় তখন আমি লজ্জা পেয়েছিলাম। তিনি বলেন, আমার আজ গর্ব হচ্ছে, আমি কবির স্নেহধন্য ছিলাম।
বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সৈয়দ ইকবাল বলেন, শুদ্ধতম এবং অধ্যাত্ম সাধক ছিলেন আসাদ চৌধুরী। আমাকে বাংলা একাডেমিতে ডেকে নিয়ে লাল চা এবং নুনতা বিস্কুট খেতে দিয়েছিলেন। যা আমার জন্য স্মরণীয় ঘটনা।
কবি দেলওয়ার এলাহীসহ বেশ ক’জন বক্তা উল্লেখ করেন, একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, অসাম্প্রদায়িকতা আর আবহমান বাংলা সংস্কৃতি ছিল কবির মূল চেতনা, মূল আদর্শ। বর্তমান দৃশ্যপটের বাংলাদেশে কবির অভাব অনেক বেশী মাত্রায় অনুভুত হচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে কবির চেতনা আর আদর্শ ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে কবিকে নিয়ে অনেক বেশী চর্চা করতে হবে, কবির গভীরে ডুবে যেতে হবে।
বাংলা মেইল-এর সম্পাদক ও এনআরবি টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী শহীদুল ইসলাম মিন্টু কবিকে আরও বেশী চর্চার উপর গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশী কমিউনিটির সম্প্রীতি বাড়াতে কবির আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান।
বিশিষ্ট সমাজসেবক ডা. নুরুল্লাহ তরুন বলেন, কাব আসাদ চৌধুরী সবাইকে একসাথে নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসতেন। তিনি ভালোবাসা, সাম্য, ঐক্য ও বন্ধনের কথা বলতেন। আমরা তার এই দর্শনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।
এভাবে কবি’র ঘনিষ্ঠজন, স্নেহধন্য অনুরাগীরা কবির সাথে তাদের বিভিন্ন স্মৃতি তুলে ধরে কবিকে একজন অনবদ্য অনন্য মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, কবি এই শহরে অকাতরে ভালবাসা ছড়িয়েছেন, আমাদের শিখিয়েছেন কিভাবে ভালবাসতে হয়। আকাশের মতো উঁচু হয়েও তিনি সব সময় মাটির গান গেয়েছেন। কানাডা’র বাংলাদেশী কমিউনিটি ভাগ্যবান যে কবি এখানে শুয়ে আছেন। তাঁর স্মৃতি ও আদর্শ অনাগত কাল আমাদের পথ দেখাবে, অণুপ্রানিত করবে।
অন্যান্যের মধ্যে কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন সুশীতল চৌধুরী, এডভোকেট মোহাম্মদ শাজাহান, কবি কাজী হেলাল, সুমন সাইয়েদ, মাহমুদুল ইসলাম সেলিম, আমিন মিয়া, হিমাদ্রি রয়, নাজমা কাজী, নওশের আলী, ফায়জুল করিম, ফখরুল চৌধুরী মিলন, জাকির হোসেন, আরিয়ান হকসহ অনেকেই।
কবির কবিতা আবৃত্তি করেন খেলাঘরের ছোট্ট বন্ধু এঞ্জেল ডি’কস্টা, আবৃত্তিশিল্পী সুমন মালিক ও ফারহানা আহমেদ। কবিকে নিবেদিত কবিতা আবৃত্তি করেন আবৃত্তিশিল্পী ও বাচনিক আহ্বায়ক মেরী রাশবায়। কবি-কে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন তাসমিনা খান ও ঋতুশ্রী ঘোষ। সঙ্গীত পরিবেশনায় ছিলেন টরন্টোর প্রিয় দুই শিল্পী ফারহানা শান্তা ও নাহিদ কবির কাকল।
সবার শেষে কবিপত্নী সাহানা চৌধুরী, কবিপুত্র আসিফ ও কবিকন্যা নুসরাত জাহান শাঁওলিসহ কবি পরিবারের চার সদস্য তাঁদের অভিব্যক্তি জ্ঞাপন করেন। এধরণের আবেগ ও ভালয়াবসাসিক্ত আয়োজনের জন্য তারা খেলাঘর কানাডার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। কবির প্রতি সবার শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় তাঁরা আপ্লূত উল্লেখ করে কবির জন্য সবার দোয়া কামনা করেন এবং কানাডার বৃহত্তর বাংলাদেশী কমিউনিটির প্রতি আন্তরিক ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানান।
সঞ্চালক ও খেলাঘর কানাডা’র আহ্বায়ক জামিল বিন খলিল কবি পরিবার ও উপস্থিত সকলের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। কবি আসাদ চৌধুরীর দেখানো পথেই একাত্তর আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটা অসাম্প্রদায়িক পরিমন্ডল তৈরির জন্যই খেলাঘর কানাডা কাজ করে যাবে বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন এবং এই পথচলায় সবার অব্যাহত সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করেন। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

