
গত ৩১ আগস্ট গ্রেটার টরন্টোর লিভিং আর্ট সেন্টারের অন্যতম অভিজাত হ্যামারসন হলে, অত্যন্ত আলিশান ভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গুণী ও সফল গজলশিল্পী, শোয়েব মোর্তজা’র একক গজল পরিবেশনার অনুষ্ঠান ‘টাইমলেস গজলস উইথ শোয়েব মোর্তজা’। টরন্টো শহর থেকে মিসিসাগা শহরের দূরত্ব সেদিন হার মেনেছিল শ্রোতাদের শোয়েব মোর্তজা’র সঙ্গীত সুধায় অবগাহনের আকর্ষণের কাছে। টরন্টো শহরে সেদিন উল্লেখযোগ্য আরও ইভেন্ট থাকা সত্ত্বেও, টিকেট কেটে টরন্টো শহর থেকে শুরু করে আশেপাশের অন্যান্য শহরগুলো থেকে ছুটে এসেছিলেন দর্শকশ্রোতারা। মেহফিল পূর্ণ করা দর্শক সমাগম, পিনপতন উপস্থিতি, অনুষ্ঠান শেষে দর্শকদের মুগ্ধতা আর সন্তুষ্টি দেখে গুণী শিল্পী, শোয়েব মোর্তজা ঘোষণা দেন যে, এই রকম আয়োজন তিনি প্রতিবছরই অন্তত একবার করতে চান। তিনি বিনীত চিত্তে অনুরোধ করেন তাঁর দর্শকদের সেই সকল আয়োজনে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতে আর গজলশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে।
অনুষ্ঠানটিতে শোয়েব মোর্তজা’র অসাধারণ সুরেলা কণ্ঠের তরণীকে অবলীলায় শেষপর্যন্ত ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন ছয় সদস্যের যন্ত্রীদল, যাঁদের প্রত্যেকেই শুধু টরন্টো কিংবা জিটিএ, অথবা কানাডা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে অসংখ্য খ্যাতি অর্জন করেছেন স্বীয় শিল্প প্রদর্শনে। যন্ত্রশিল্পীদের মাঝে ছিলেন তবলায় ডেরিক জয়করন, যার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে রয়েছে চারটি দশকের অভিজ্ঞতা। শোয়েবের সাথে তাঁর সাংগীতিক জীবনের বয়সও পেরিয়েছে একটি যুগ। কিবোর্ডে ছিলেন রুপতনু শর্মা। রুপতনু বাংলাদেশ, ভারত, ইউরোপ, কানাডা, আমেরিকাসহ বিশ্বের নানান দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন বেশ ক’দশক ধরে, প্রায় সকল লেজেন্ডারি সঙ্গীত শিল্পীদের সাথে। প্রায় বত্রিশ বছর ধরে প্রচুর কিংবদন্তীসম গায়ক- গায়িকার সাথে মঞ্চভাগের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর অভিজ্ঞতার ঝোলায়। যন্ত্রীদের মাঝে প্রত্যেকেই ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এবং বর্তমানে কানাডাতে বেশ প্রতিষ্ঠিত। আমাদের ট্র্যাডিশনাল গানগুলোকে খানিকটা পশ্চিমাকরণ করে পরিবেশন করে ইতিমধ্যেই প্রভূত খ্যাতি কুড়িয়েছেন গিটারিস্ট জয় সরকার। বিশ্বমানের বেইস গিটারিস্ট জেকব থমাসের সুরের মূর্ছনাতে গভীরতা পেয়েছিল মেহেফিলের প্রতিটি পরিবেশনা। সুরের জাদুতে আরও সংযোজনা করেছিলেন বংশীবাদক বাসু বিস্ত। তাঁর বাঁশির মায়াবী মায়াজালে মুগ্ধ ছিলেন অডিটোরিয়ামের সকল দর্শকশ্রোতা। এছাড়াও ষষ্ঠ যন্ত্রী ছিলেন পারকেশন আর ঢোলকবাদক এলেক্স মোহন। পুরোটি অনুষ্ঠান তাঁর ঢোলকের তালে আর পারকেশনের ছন্দে প্রাণবন্ত হয়ে ছিল পুরো সাড়ে তিনটি ঘণ্টা জুড়ে। অনুষ্ঠানটি যথাসময়ে শিল্পী শেষ করতে চাইলেও তাঁর সুরের মায়াবী জালে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা দর্শকদের অনুরোধে সময় সীমা পেরিয়েও শিল্পিকে গেয়ে যেতে হয় আরও বাড়তি দুটো গান। অবশেষে দর্শকদের অনুরোধে ‘চান্দি জ্যায়সা রাঙ্গ হ্যায় তেরা’ গানটি পরিবেশন করে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানেন শিল্পী শোয়েব আর সেই গানের কলিটি গুনগুন করে গাইতে গাইতেই বাড়ি ফেরেন সন্তষ্ট দর্শকেরা।
অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন, লেখিকা এবং মিডিয়া ব্যাক্তিত্ব তাসমিনা খান এবং কামিনী সিং। তাঁদের সঞ্চালনায় প্রাণবন্ত হয়ে ছিল পুরো সন্ধ্যা। মাল্টিকালচারাল দর্শকদের সাথে সফলভাবে সংযোগ স্থাপন করতে সঞ্চালিকাদয় বাংলা, হিন্দি, উর্দু, এবং ইংরেজি ভাষায় অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেছেন সাবলীলভাবে। দর্শকদের সাথে কথোপকথন আর সংযোগ স্থাপনের দক্ষতায় তাঁরা মন কেড়ে নিয়েছেন উপস্থিত দর্শকদের।
উর্দু কাব্যের অধীশ্বর মির্জা গালিবের সৃষ্টিকে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের ‘গজল কিং’ বলে খ্যাত জগজিৎ সিং গজল গেয়ে পরিবেশন করেছেন আমৃত্যু। এই অনুষ্ঠানটিতে সেই সমৃদ্ধ সম্ভার থেকে পরিবেশন করে অনুষ্ঠানটিকে এক অতি উচ্চ মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছেন শোয়েব মোর্তজা। শোয়েব মোর্তজা অনুষ্ঠানটি শুরু করেন ওমর খইয়্যামের অমর সৃষ্টি ‘রুবাইয়্যাত’ দিয়ে, এরপর তিনি একে একে পরিবেশন করেন পঙ্কজ উদাসের গাওয়া আরও কিছু কালজয়ী গজল, জাগজিৎ সিং, মেহেদি হাসান, হরি হরণ, এবং জনপ্রিয় কিছু সিনেমার গান। মুহুর্মুহু করতালিতে মুখর ছিল পুরোটি অডিটোরিয়াম পুরোটি সন্ধ্যা জুড়ে। শিল্পীর সাথে শ্রোতাদের ক্ষণেক্ষণে গেয়ে ওঠা, হাতে তাল দিয়ে চলা, তালি বাজিয়ে চলা, নিজের প্রিয় গজলগুলো শিল্পীর কণ্ঠে শুনবার জন্য মঞ্চে অনুরোধ বার্তা প্রেরণ নিশ্চিত করেছে ‘টাইমলেস গজলস উইথ শোয়েব মোর্তজা’ অনুষ্ঠানটির গ্রহণযোগ্যতা আর সার্থকতা।
‘টাইমলেস গজলস উইথ শোয়েব মোর্তজা’ ইভেন্টটিকে সার্থক করতে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন বিভিন্ন ভাষাভাষী আর সম্প্রদায়ের স্পন্সরেরা। তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় দেশ কিংবা সম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে সঙ্গীত পেয়েছে এক অতি উচ্চ মর্যাদা। অনুষ্ঠানটিতে স্পন্সর হিসেবে ছিল রাইড-এলাইক, পপি’স আর্ট অফ কুকিং, ওয়াইসিপি মিডিয়া, আমির’স, ইএক্সপি রিয়েলিটি ব্রোকারেজের পক্ষ থেকে শারমিন শরিফ, রিয়েলিটি টুয়েন্টি ওয়ান থেকে নারগিস সুলতানা, অগমেন্টরস ক্যারিয়ার এন্ড বিজনেস হাব এর পক্ষ থেকে সন্দীপ কুমার, ব্যারিস্টার মিনা প্যাটেল, আমরা বাংলাদেশি কেনেডিয়ান (এসিবি), বাংলাদেশি ফুড লাভারস ইন ক্যানাডা (বিএফএলসি), আর ফায়ার ফ্লাইস বাই লাবনি। অনুষ্ঠানটির সার্বিক পরিকল্পনা আর তত্ত্বাবধানে ছিলেন শোয়েব মোর্তজার সুযোগ্য সহধর্মিণী লিসা শোয়েব। ইভেন্টটিকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার দায়িত্বে ছিল জেবিআর ইভেন্টস আর এতে মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিল কানাডার প্রথম চব্বিশ ঘন্টার বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল এনআরবি টিভি এবং মাসালা টিভি। অনুষ্ঠান শেষে এরকম আরও অনেক গজল সন্ধ্যার আকুতি জানিয়ে হলত্যাগ করেছেন ‘টাইমলেস গজলস উইথ শোয়েব মোর্তজা’ ইভেন্টের সকল দর্শকেরা।

