
কানাডার টরন্টোতে সম্পন্ন হয়েছে জনপ্রিয় তারকা মোশাররফ করিম অভিনীত টেলিফিকশন ‘চক্র’। সঙ্গে আছেন আরেক জনপ্রিয় অভিনেত্রী তানজিকা আমিন। এনআরবি টিভির প্রযোজনায় নির্মিত এই নাটকের মাধ্যমে দীর্ঘ তেইশ বছর পর পরিচালনায় ফিরলেন এক সময়ের দর্শকনন্দিত নির্মাতা শহিদুল ইসলাম মিন্টু। এটি মোশাররফ করিম ও তানজিকা আমিনের কানাডায় চিত্রায়িত প্রথম নাটক।
বাংলাদেশে ছোটপর্দায় জনপ্রিয় নাটক ও টেলিফিল্ম ‘দেবদাস’, ‘প্রিয়তমাসু’, ‘বাজিমাত’, ‘প্রতিশোধ’ এবং এনটিভির প্রথম মেগা সিরিয়াল ‘এবং আমি’-এর মতো আলোচিত কাজের পরিচালক শহিদুল ইসলাম মিন্টু বর্তমানে কানাডা ভিত্তিক প্রথম ২৪ ঘণ্টার বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল এনআরবি টিভির সিইও এবং সাপ্তাহিক বাংলামেইল পত্রিকার সম্পাদক। দীর্ঘদিন পর আবার ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ তেইশ বছর পর আবারও আমি টেলিভিশন নাটক নির্মাণে ফিরলাম। এই দীর্ঘ বিরতির পর আমার প্রত্যাবর্তন কেবল একটি নাটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আমার শিল্পীসত্তার পুনর্জন্ম। ‘চক্র’ ভিন্নধর্মী নির্মাণ। এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের গভীর দর্শন, সময়ের প্রতীক, এবং মানুষের অস্তিত্ববাদী প্রশ্ন।”
তিনি আরও বলেন, “‘চক্র’ কেবল একটি গল্প নয়, এটি মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রতীকী নাট্যরূপ। আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছে যারা জীবনের ভার বহন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়। অপূর্ণতা আর অসম্পূর্ণতার হাহাকার তাদের প্রতিটি মুহূর্তকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এই নাটকের প্রধান চরিত্র যেন সেইসব মানুষেরই প্রতিচ্ছবি—যে চরিত্রটি সবকিছু ভুলে যাবার অভিনয় করে, কিন্তু তার ভুলে যাওয়া আসলে পালানোর চেষ্টা। সে চায় জীবন থেকে পালাতে, কিন্তু জীবনের চক্র তাকে আবার ফিরিয়ে আনে একই জায়গায়।”
পরিচালক জানান, নাট্যতত্ত্বে বলা হয়—নাটক কেবল বিনোদন নয়, এটি জীবনের প্রতিফলন। তাঁর মতে, এই নাটকে অনুকরণের ভেতরে অনুকরণ নেই, বরং আছে প্রশ্ন। “আমি চাই দর্শক কেবল গল্প উপভোগ করুক না, বরং নাটক শেষে নিজের ভেতরেও প্রশ্ন তুলুক—আমরা কি সত্যিই জীবন থেকে পালাতে পারি, নাকি আমাদের সব চেষ্টা এক অদৃশ্য চক্রের ভেতর ঘুরপাক খাওয়া মাত্র?”
নাটকে ব্যবহৃত হয়েছে প্রতীকবাদ ও মেটা-থিয়েটারের উপাদান, যেখানে বাস্তবতা ও স্বপ্ন, স্মৃতি ও বিস্মৃতি, সত্য ও অভিনয় একে অপরকে ভেঙে দেয়। মিন্টু বলেন, “ব্রেখট যেমন বলেছেন, নাটক দর্শককে কাঁদাতে নয়, ভাবাতে হবে—আমি সেই দর্শনকেই অনুসরণ করেছি। ‘চক্র’-এর দর্শক আবেগে ডুবে যাবে, আবার সেই আবেগ থেকেই নতুন চিন্তার জন্ম নেবে।”
তিনি আরও বলেন, “এই নাটকের প্রাণপুরুষ মোশাররফ করিম। তাঁর অভিনয়ে চরিত্রটি যেন রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে উঠেছে। তাঁর অভিনয় অনেকটা স্টানিস্লাভস্কির মেথড অ্যাক্টিং-এর মতো, যেখানে অভিনেতা আর চরিত্রের সীমানা মুছে যায়। ফলে দর্শক চরিত্রের হাহাকার, তার ভেতরের শূন্যতা, সবকিছু নিজের ভেতরে অনুভব করতে পারবে।”
নাটকের কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন তানভীর নাওয়াজ, যিনি দীর্ঘ আট বছর পর নাট্যরচনায় ফিরেছেন এই নাটকের মাধ্যমে। তিনি এর আগে লিখেছেন জনপ্রিয় নাটক ‘বিকেল বেলার গল্প’, ‘অনেকের মধ্যে একা’, ‘যদি যেতে দিতে হয়’ এবং ‘রাত আর রাত্রি’। নাট্যকার তানভীর নাওয়াজ বলেন, “অনেক বছর পর লেখালেখিতে ফিরে দারুণ লাগছে। মিন্টু ভাইয়ের পরিচালনা আর মোশাররফ ভাইয়ের অভিনয়ের নাটক লিখতে পারা আমার জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। তাদের উৎসাহ না পেলে হয়তো ফিরতে পারতাম না।”
টরন্টোর বিভিন্ন মনোরম লোকেশনে সপ্তাহব্যাপী হয়েছে ‘চক্র’-এর শুটিং। সদ্য কানাডা আগত এক পিতা-পুত্রের প্রবাস জীবনের সংগ্রাম, মানসিক দ্বন্দ্ব ও অস্তিত্বের প্রশ্ন নিয়েই নির্মিত হয়েছে এই নাটক। এতে আরও অভিনয় করেছেন নির্জলা প্রিয়দর্শিনী, রেহান বিন তানভীর, ডা. নুরুল্লাহ তরুন, মাসুদ করিম, সাদেকুর সুজন, মোহাম্মদ চৌধুরী বিপ্লব, শেখ আনোয়ার হোসেনসহ টরন্টোর বাংলা কমিউনিটির কয়েকজন পরিচিত মুখ।
পরিচালক মিন্টু বলেন, “‘চক্র’ আসলে মানুষের চিরন্তন সংকটের প্রতীক। অস্তিত্ববাদী দর্শন যেমন শেখায়, মানুষ অর্থহীনতার ভেতর অর্থ খোঁজে—আমার নাটকের চরিত্রও সেই অর্থের সন্ধানে। কিন্তু প্রতিবারই সে এসে পড়ে এক অদৃশ্য বৃত্তে, এক অনন্ত চক্রে। তাই নাটকের নাম শুধু একটি শিরোনাম নয়, বরং জীবন নামের চক্রের প্রতি এক দার্শনিক ইঙ্গিত।”
এনআরবি টিভির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘চক্র’ এনআরবি টিভির প্রথম নাট্যপ্রযোজনা। নাটকটি আগামী ডিসেম্বর মাসে টরন্টোতে জমকালো আয়োজনে প্রিমিয়ার করা হবে।

