শুক্রবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৪
8.2 C
Toronto

Latest Posts

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ ।। পর্ব-৬৮।।

- Advertisement -

উনিশশো একাশি সালের আঠারো নভেম্বর আমি কাস্টমসের চাকরিতে যোগদান করি। ‘জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণে’র অনেকগুলো পর্বে জীবনের সঙ্গে বহমান সময়ের ধারায় দেখা রাজনৈতিক,সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনের কিছু ঘটনাবলীর পাশাপাশি চাকরিজীবনেরও কিছু কিছু কথা আমি বলেছি এবং বর্তমান পর্বে আমি চাকরি জীবনের শেষ অধ্যায়টির যৎসামান্য উল্লেখ করব।

- Advertisement -

‘জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণে’র গল্প শুরু হয়েছিল আমার শৈশব কৈশোরের প্রিয়ভূমি যাকে আমি ‘পৃথিবীর জান্নাত’ বলি,সেই এনজিএফএফ ছেড়ে জেলাশহরে পড়তে যাওয়ার গল্পের মধ্য দিয়ে। “উত্তরের শীত কেটে সিলেট মেইল ছোটে। ছোট্ট মাইজগাঁও স্টেশনের প্লাটফর্মে রেলের পাটাতনে পা রাখার আগে গল্পগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল সহপাঠীদের কাছে। তখন ভোরবেলার মিষ্টি রোদটা পশমি চাদরের মতো জড়িয়ে থাকে সবার গায়ে।

হুইসেল দিয়ে রেলগাড়িটা আসে,কী দর্প তার! আমরা সভয়ে সরে দাঁড়াই। এই প্রথম আমাদের বাঁধন ছাড়ার দিন।….”
‘জগতে আনন্দযজ্ঞে’র নানা পর্বে আমার শৈশব-কৈশোরের কিছু কিছু গল্প আপনা থেকেই উঠে এসেছে, এই পর্বে চাকরি জীবনের কথা হয়তো শেষ হবে,কিন্তু গল্পগুলো তো রয়ে যাবে। গল্প তো জীবনের নিগুঢ় সত্য উচ্চারণ, ওটা ঘটনা নয়,উপলব্ধিজাত,তাই ‘জগতে আনন্দযজ্ঞে’র চলমান পর্বগুলোয় সে গল্পের কোনো কোনোটি কখনো উচ্চারিত হতে পারে!

বন্ড কমিশনারেটের চাকরিই আমার শেষ পোস্টিং। দুই হাজার ষোলো সালের পঁচিশ জুলাই আমি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করি। বন্ড কমিশনারেটের চাকরি হলো প্রধানত গার্মেন্টস ইণ্ডাষ্ট্রির শুল্কমুক্ত কাঁচামাল বন্ডেড ওয়ার হাউজে সঠিকভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে কিনা এবং এই কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য (রেডিমেড গার্মেন্টস ও অন্যান্য) যথানিয়মে অর্থাৎ কাস্টমস অ্যাক্ট ও বিধি প্রতিপালন করে রপ্তানি করছে কিনা,সেটা নজরদারি করা। বন্ড কমিশনারেটেও সার্কেল কর্মকর্তা ( রেভেনিউ অফিসার /সুপারিন্টেন্ডেন্ট) কমিশনার কর্তৃক বন্টনকৃত নির্ধারিত এলাকা ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকেন। সহকারী কমিশনার /ডেপুটি কমিশনার কয়েকটা সার্কেল সমন্বয়ে গঠিত বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশে শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে রেডিমেড গার্মেন্টস রপ্তানির ক্ষেত্রে বন্ড ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বাংলাদেশে ১৯৭৮ সালে প্রথম রিয়াজ গার্মেন্টস কর্তৃক প্যারিসে দশহাজার পিস ছেলেদের শার্ট রপ্তানির মাধ্যমে গার্মেন্টস শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। ওই কনসাইনমেন্টের রপ্তানিমূল্য ছিল ১৩ মিলিয়ন ফ্রাঙ্ক অর্থাৎ তৎকালীন বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪ লক্ষ ২৭ হাজার টাকা। তখন বন্ড ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা কমিশনারেট ছিল না। ঢাকা কালেক্টরেটের কালেক্টর ছিলেন শাহ আবদুল হান্নান। তিনিই প্রথম বন্ড ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে স্ট্যান্ডিং অর্ডার জারি করেন। এই কাজের দাপ্তরিক কাজগুলো করা হতো কাস্টমস শাখায়। এই শাখার আধিকারিক ছিলেন রেজাউল করিম খোকন। পরবর্তীতে তিনি সুপারিনটেনডেন্ট পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। রেজাউল জানালেন,ওইসময় প্যারিশ গার্মেন্টস, জুয়েল গার্মেন্টস, বৈশাখি গার্মেন্টস, বন্ড গার্মেন্টস, এরিস্ট্রোক্র্যাট,ব্রাদার্স নামের আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্ড লাইসেন্স গ্রহণ করে। রিয়াজ গার্মেন্টস ষাটের দশক থেকে রিয়াজ শার্ট বানাতো এবং খুবই জনপ্রিয় ব্রান্ড ছিল। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির মালিক রিয়াজউদ্দিন প্যারিসের একটা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন এবং এই রপ্তানি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন।

এই সফলতার পর অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল কাদের খান ‘দেশ গার্মেন্টস’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনিই প্রথম দক্ষিণ কোরিয়ার দাইয়্যু কোম্পানির সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহায়তা গ্রহণের পাশাপাশি শ্রমিক ও টেকনিশানদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। বাংলাদেশে শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় তিনিই পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব। ১৯৮০ সালে তাঁর রপ্তানিমুখী বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে বিদেশে পোশাক রপ্তানি শুরু হয়। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৮১-৮২অর্থবছরে রপ্তানিতে এইখাতের অবদান ছিল মাত্র ১.১% আর চল্লিশ বছর পর ২১-২২ অর্থবছরে ৪২.৬১৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয় যা মোট রপ্তানির ৮১.৮১ ভাগ।

বর্তমানে ওভেন গার্মেন্টস থেকে নন-ওভেন গার্মেন্টস টি-শার্ট এবং তারপর কালক্রমে প্যান্ট,জ্যাকেট, উলেন গার্মেন্টস, ছোট ছোট ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও পার্টস,হীরার অলঙ্কার- কী নেই বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিকৃত পণ্যের তালিকায়! বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। চীন প্রথম। প্রথম দিকে বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার অনুসারে ব্যাক টু ব্যাক এলসি-র মাধ্যমে তাদের নির্দেশিত উৎস থেকে কাপড় সংগ্রহ করে, তাদের সুতা,বোতামসহ অন্যান্য একসেসরীজ ব্যবহার করে তাদেরই ফরমায়েশ অনুসারে পণ্য উৎপাদন করে তাদের নির্দেশিত প্যাকেজিং সামগ্রী ব্যবহার করে পণ্য রপ্তানি করতে হতো। এতে করে অনেক সময় শ্রমিক বা কর্মকর্তার অদক্ষতায় রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে যেত এবং রপ্তানিকারক বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হতেন। ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। স্থানীয়ভাবে পশ্চাত-সংযোগ (backward linkage) শিল্পের বিকাশ ঘটে, দেশেই প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন প্রকার এক্সেসরীজের শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের এই ধারাবাহিক উন্নয়ন যাত্রায় উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও শিল্প মালিকদের আইনী সহায়তা,আইডিয়া শেয়ার এবং পাশাপাশি দুষ্টু ব্যবসায়ী কর্তৃক আন্ডার ইনভয়েসিং-ওভার ইনভয়েসিং করে রাষ্ট্রের অর্থ পাচার ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণসহ নানা ভূমিকায় কাস্টমস কর্মকর্তাগণ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় ব্যবসায়ীমহলের সহযোগী একইসাথে রাষ্ট্রীয় অর্থের সুরক্ষক (protectors) হিসেবে ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস ইণ্ডাষ্ট্রি গড়ে ওঠার ফলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সূচক বহুদূর বৃদ্ধি হয়,এটা সত্যি। কিন্তু এই শিল্প বিকাশের ফলে নীরবে বা সরবে বাংলাদেশে এক মহান সামাজিক বিপ্লব ঘটে যায়। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত আমাদের গ্রামীন শ্রমজীবী নারী ও চরাঞ্চলের নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন নারী,শহরাঞ্চলের বস্তিবাসী নারী ও কিশোরী মেয়েরা এই শিল্পের শ্রমিকশ্রেণির প্রধান অংশীজন হয়ে ওঠে। প্রথমত তাদের শ্রমের কম মজুরি, তাদের শান্ত প্রকৃতি ও কর্মকুশলতা কারণে সহজেই তারা এই শিল্পের প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে। প্রথমদিকে মৌলবাদী একটা গোষ্ঠী ব্যাপকভাবে তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে,যা এখনও তারা কৌশল করে উচ্চারণ করে। তারা পরদার সর্বনাশ করেছে, জাহান্নাম তাদের ঠিকানা, তাদের সম্ভ্রম নিরাপদ নয়, এমন হাজার কথা ও নেতিবাচক প্রচারণার মধ্যেই এই মেয়েরা উঠে দাঁড়িয়েছে। প্রথম সত্যটা হলো দূরবর্তী দোজখের আগুনের জ্বালার চেয়ে পেটের ক্ষুধার জ্বালা ভয়াবহ। মাঝেমধ্যে গার্মেন্টস নারী শ্রমিকদের কারো কারো সম্ভ্রম হারাবার কথা শোনা যায়,এমনকি মৃত্যুর মতো নৃশংসতার কথাও, কিন্তু তার একটাও তাদের কর্মক্ষেত্রে ঘটেনি।

বর্তমানে প্রায় পঁচিশ লক্ষ মেয়ে শ্রমিক এই সেক্টরে কাজ করেন। তাদের নিজেদের জীবন-মানের পরিবর্তন ঘটেছে, তাদের পরিবারগুলো স্বচ্ছল হয়েছে,তাদের পরমুখাপেক্ষী জীবনের অবসান হয়েছে। দেনার দায় থেকে পরিবারগুলো কেবল মুক্তই হয়নি,স্বাবলম্বী হয়েছে, একেকটি মেয়ের কল্যাণে পরিবারের অন্যান্য ভাই-বোনগুলো স্কুলমূখী হবার সুযোগ পেয়েছে। ‘বাবা,ভাই বা স্বামীর পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কর্তৃত্ব’ ভেঙে এই শ্রমজীবী মেয়েরা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় সরাসরি ভূমিকা তো রাখছেই, অন্যান্য পরিবর্তনগুলোও কিন্তু চোখে পড়ার মতো। বাল্য বিবাহের সংখ্যা কমে গেছে, স্কুলগুলোয় মেয়েদের ব্যাপকভাবে উপস্থিতি বাড়ছে, দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে, এবং গ্রাম পর্যায়েও উদ্যোক্তা নারী শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে।
আমি বন্ড কমিশনারেটে যোগদান করার পর রূপগঞ্জ, কালীগঞ্জ ও নরসিংদী উপজেলা নিয়ে গঠিত বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত হই। আমাদের কাজের ফিরিস্তি দীর্ঘ, সে-সব বর্ণনা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার পরের পোস্টিং হলো সাভার,গাজীপুর নিয়ে গঠিত বিভাগে। এই বিভাগটিও আগেরটার মতো আয়তনে বিশাল,অনেক রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান এখানেও। বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রদান, প্রাপ্যতা নির্ধারণ ও রপ্তানি সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ও অডিট কার্যাবলী ইত্যাদি নানাবিধ কাজের সঙ্গে আমাদের সংশ্লিষ্ট থাকতে হয়। বন্ড কমিশনারেটে অ্যাডজুডিকেশনের ব্যাপারটি ছাড়া ইন্সপেক্টর থেকে শুরু করে কমিশনার পর্যন্ত সকলেই সম্মিলিতভাবে কাজ করেন,চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষমতা কমিশনার মহোদয়ের।

গার্মেন্টস ইণ্ডাস্ট্রিগুলোর বড়ো বড়ো পদগুলোয় আর্মির রিটায়ার্ড অফিসাররা মোটা বেতনে চাকরি করতেন। মালিকদের ধারণা ছিল সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা কাস্টমস কর্মকর্তাদের উপর প্রভাব খাটিয়ে বণ্ড অফিসে তাদের কাজগুলোকে সহজে আদায় করে দিবেন। যে কাজগুলো নির্ধারিত সময়ের ভেতর করে দিতে কাস্টমস কর্মকর্তারা কমিটেড থাকতেন, সেটার তদবির প্রয়োজন হতো না। তবু প্রায়ই কারখানাগুলোর বন্ড রিলেটেড অফিসারের সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা অফিসে চলে আসতেন। শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে হয়তো তারা ক্রেডিট নিতেন,যদিও তার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

একদিন হলো কী,সাভারে একটা নতুন কম্পোজিট কারখানায় গেলাম লাইসেন্সের তদন্ত করতে। আমার সঙ্গে আছেন সার্কেল কর্মকর্তা আর প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহ. রাজস্ব কর্মকর্তা। বিশাল এলাকাজুড়ে কারখানার ক্যাম্পাস। মালিক ভদ্রলোক তার নতুন নতুন ভবনে প্রতিস্থাপিত মেশিনারিজ, সেলাই কলের সারি, ওয়াশিং প্লান্ট, বন্ডেড ওয়ারহাউস, ইটিপি প্লান্ট ইত্যাদি দেখানোর পর আমাকে নিয়ে চললেন তাদের বিলাসবহুল গেস্ট হাউসে। এটা কারখানা এলাকার থেকে একটু ভেতরের দিকে। গজারি গাছের খুঁটি, কাঠের পাটাতন আর দেশীয় উপকরণ ব্যবহারের পাশাপাশি রঙিন কাচের দেওয়াল, ইম্পোর্টেড বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, টাইলস,স্যানিটারী সমগ্রীর ব্যবহার করে তিনতলা এই গেস্টহাউস বানানো হয়েছে। আমাদের দুপুরের লাঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়েছে সেখানে। আমরা যখন গেস্ট হাউসের দিকে যাচ্ছি তখন প্রতিষ্ঠানের মালিক ও তার নতুন নিয়োগ পাওয়া তিনজন অবসরপ্রাপ্ত লেঃ কর্নেল / কর্নেল পদমর্যাদার কর্মকর্তাও সঙ্গে চলছেন। চলতে চলতে মালিক ভদ্রলোক আমাকে ‘স্যার স্যার’ করে কথা বলছিলেন। আমি ডেকোরাম রক্ষার জন্য কর্নেলদের ‘স্যার স্যার’ করছিলাম আর কর্নেলরা মালিক ভদ্রলোককে ‘স্যার স্যার’ করছিলেন।

একরকম অভিজ্ঞতা আমার অনেকবারই হয়েছে। অভিজ্ঞতার শেষ নেই। জীবনের বরণডালায় অভিজ্ঞতার যে বিশাল সঞ্চয় তা এই কাস্টমস ডিপার্টমেন্টে চাকরি না করলে কখনো পরিপূর্ণ হতো না। বদলির চাকরির কারণে ঘুরে বেড়িয়েছি দেশের নানা অঞ্চলে, নানা গড়ণ-বরণ ও ভাষার মানুষের সঙ্গে মিশেছি। আয়তনে ছোট্ট একটা দেশ আমাদের অথচ কতো বিচিত্রিতায় ভরা বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ, একটার সঙ্গে আরেকটার মিল খুব কম,মানুষের ক্ষেত্রেও একই কথা। কথায় আছে প্রতি দুই মাইল ব্যবধানে ভাষার পরিবর্তন হয়। আমার কাছে মনে হয়েছে,কেবল ভাষা নয়, মানুষের স্বভাব ও ব্যাবহারেও পরিবর্তন ঘটে যায়। দিনাজপুর থেকে পিরগঞ্জ গেলেই ভাষা ও মানুষের ব্যবহারের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। রাজশাহী শহরাঞ্চলের ভাষার সঙ্গে ম্যালা অমিল চাঁপাই নবাবগঞ্জের ভাষায়। দেশবিভাগের করুণ অশ্রুপাতের মধ্যেই মুর্শিদাবাদ থেকে এই অঞ্চলে চলে আসে অনেক মানুষ। তাদের শরীরের কাঠামো দীর্ঘ, রংও চাপা। নওগাঁ-নাটোর-রাজশাহীর মানুষের ভাষা সুমিষ্ট, তাদের শরীরের রঙেও জাদু। বৃহত্তর চট্টগ্রামের ভাষায়ও রয়েছে বৈচিত্র। মোটা দাগে চারটা। মীরসরাই-সীতাকুন্ডের ভাষায় ফেণির ভাষার টান, সদর টট্টগামের ভাষার সঙ্গে মিল নেই কক্সবাজারের ভাষায়, হাটহাজারী-দোহাজারি-ফটিকছড়ির ভাষায় চট্টগ্রামের মূলভাষার কত যে অমিল,একটু কান পাতলেই বুঝা যায়।যে সিলেটের ভাষা নিয়ে এত অপবাদ,তার যে অসাধারণ সুন্দর একটা ব্যাকরণ রয়েছে, সেটা আগের একটা পর্বে উল্লেখ করেছি। সেখানেও মোটাদাগে চারটি ভাষা। হবিগঞ্জ, আজমিরিগঞ্জ, মাধবপুর, চুনারুঘাট-এইটুকু জায়গাও কারো ভাষায় সিলেটি ভাষা নেই। সুনামগঞ্জ সিলেটের ভাষায়ও তো কতো অমিল।

নোয়াখালীর ভাষায়ও একই গল্প। সমুদ্র উপকূলের নোয়াখালী-সন্দীপ প্রায় এক ভাষাতেই কথা বলে। তাদের ভাষায় পর্তুগীজদের শব্দ ও ফ্রেঞ্চদের নাসিকার টান আছে,কারণটা ঐতিহাসিক। কিন্তু ফেণির লোকেরা নোয়াখালীর ‘আমরা’কে কেন ‘আন্ডা’ বলে? বরিশাল যে কোথা থেকে সাগরকুলে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মতো এমন পাড়ভাঙা ভাষা পেল জানি না। এই কিছুটা না-জানা, কিছুটা জানার অভিজ্ঞানে জীবন সত্যি পূর্ণ হয়ে গেছে।
নানা মত ও পথের মানুষ দেখা, মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে দিয়েই আমার চাকরি জীবনের বড়ো অংশটি পার হয়েছে। আমার জন্য এই সম্পর্কটা খুব গুরুত্ব বহন করে। আমার সাহিত্যের ক্যানভাস জুড়ে থাকে মানুষ, মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি, মানুষের জীবন, তাদের স্বপ্ন, তাদের দুঃখ ও আনন্দ অর্থাৎ মানুষই সাহিত্যের প্রাণপ্রবাহ।

বন্ড কমিশনারেটে আমার চাকরি জীবনের শেষ পোস্টিং হলো আদমজী ইপিজেড। নিশ্চয়ই সুপ্রিয় পাঠকের মনে আছে কাস্টমসে যোগদানের আগে আমি এই আদমজীতেই চাকরি করতাম। কী এলাহি কারবার ছিল এই আদমজীনগরের! সে-সব কথা আমি আগের একটা এপিসোডে লিখেছি। আমি একটা মিলের সহকারী প্রোডাকশন অফিসার ছিলাম। ডরমিটরিতে থাকতাম। একদিন আমার বন্ধু দুলাল আদমজী এলো,আমাকে জোর ধরে নিয়ে গেল নারিন্দায়,তার বাসায়। সেখানে নানা নাটকীয়তার পর আমার হাতে তুলে দিল কাস্টমসের অ্যাপয়ন্টমেন্ট লেটার। সেই নতুন জীবন, একটানা উনত্রিশ বছরের বিরামহীন যাত্রার শেষে আবার আদমজীনগরে এলাম। আদমজীনগর তার খোল নলচে পাল্টে ফেলেছে। সেই পুরাতন দালান কোঠা,বিশাল বিশাল মিল,হাজার শ্রমিকের কর্মচঞ্চলতায় মুখর এই নগরের পথঘাট, সে-সব নেই, এখন নতুন কর্মচাঞ্চল্য, নতুন নতুন প্রকৌশলে নির্মাণ হওয়া সুন্দর সুন্দর কারখানা ভবন,অফিস ভবন। আদমজী নগরের ভেতর দিয়ে চলে গেছে মসৃণ রাস্তা, রাস্তাগুলো দিয়ে হাজার হাজার শ্রমিককে, মালিক ও কর্মকর্তাকে বয়ে নিয়ে যায় কোম্পানির / প্রতিষ্ঠানের পরিবহন যানগুলো। একটা অদ্ভুত গম্ভীর শব্দতরঙ্গ কানের পরদায় একটানা বমবম শব্দের কম্পন তোলে।

আমার দপ্তর হলো আদমজী ইপিজেডের মেইন গেটে, দোতলা ভবনে। নিচতলায় ইপিজেডের সিকিউরিটি অফিস, কাস্টমসের চেকপোস্ট। ইপিজেডে কোনো গাড়ি প্রবেশের সময় অথবা বেরোবার সময় উভয় সংস্থার জিজ্ঞাসা ও চেকিংয়ে পড়ে। এখানে কাস্টমসের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অবৈধ পণ্য বিশেষকরে প্রাপ্যতার হিসেবের অতিরিক্ত কাঁচামাল প্রবেশ অথবা রপ্তানিযোগ্য পণ্য যথাযথ ডকুমেন্টস ছাড়া বের করতে গেলেই কাস্টমসের চৌকশ ইন্সপেক্টর ও সিপাইদের হাতে ধরা পড়ে যায়। তারপরই শুরু হয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি। এইসব মামলার হিয়ারিং,বিচার করেই কাটে দিনের অনেকটা সময়। ছয়জন ইন্সপেক্টর ও একজন সুপারিন্টেনডেন্ট আমার অধীনে কাজ করেন। শতাধিক রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান রয়েছে এখানে। বাংলাদেশী মালিক ছাড়াও জাপান, কোরিয়া,চীন,বৃটেনসহ অনেকগুলো বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে এখানে। ব্রান্ডেড কোট-ব্লেজার,শার্ট-প্যান্ট আর নানারকম গার্মেন্টস পণ্য থেকে শুরু মোড়কজাত সামগ্রী, কার্টন,সুতা,জুতা,মোজা,বোতাম,নানা রকম অ্যাকসেসরিজসহ অতি মূল্যবান হীরা ও হীরার অলংকার তৈরি করা হয়। এছাড়া বিদেশি মালিক ও কর্মকর্তাদের পান করার জন্য মদ, সিগারেট ও অন্যান্য সামগ্রী শুল্কমুক্ত মূল্যে ক্রয় করার জন্য একটা বন্ডেড ওয়্যার হাউস রয়েছে। ইন্সপেক্টরদের মধ্যে এইসব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধান করার জন্য বন্টন করে দিয়েছি। তারা কাঁচামাল আমদানি, কাঁচামাল ব্যবহারের হিসাব থেকে শুরু করে পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানির সকল কাজ তদারক করেন।

সন্ধ্যা ছয়টার পর রপ্তানির কার্যক্রম বন্ধ থাকে। ব্যস্ত সময় কাটে। একটা ইন্ডাস্ট্রি চালানো সহজসাধ্য কাজ নয়।মালিক-শ্রমিক আর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। তার উপর চাপিয়ে দেওয়া সরকারের নানা আইন-বিধির জটিল বাইন্ডিংস! আমরা যারা কাস্টমস ও ভ্যাটে চাকরি করি,আমরা কিন্তু রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি ও রাজস্ব ফাঁকির ফাঁক-ফোকড়গুলো সহজেই ধরে ফেলতে পারি। কিন্তু একটা ইন্ডাস্ট্রির মেশিনারিজ ও প্ল্যান্ট চালানো কিংবা তাদের প্রশাসনিক দপ্তর চালাবার নিজস্ব পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা অতোটা জানি না। কিন্তু আমরা ভাব ধরি আমরা সব কাজই জানি ও বুঝি। কিন্তু আমাদের ভাব-সাব দেখে তারা বুঝতে পারে না আমরা হলাম ‘জ্যাক অব অল ট্রেডস বাট মাস্টার অব নান’।
আদমজী আমার জীবনে দু-দুবার বিশেষ সন্ধিক্ষণের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। আগেও বলেছি, কাস্টমসের চাকরিতে আসার আগে আমি আদমজীতে কাজ করেছি আর কাস্টমসের চাকরি যখন শেষ করছি, তখনও আমি আদমজীতেই কাজ করছি। তখন আমি ছিলাম একটা মিলের সামান্য সহকারী প্রোডাকশন অফিসার আর এখন শতাধিক শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উৎপাদন,আয়-ব্যয়, খালাস-রপ্তানির হিসাব সংরক্ষণ করি। আমি ইচ্ছে করলেই কারণে-অকারণে যে-কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে পারি। সেজন্যে আমাকে কারো অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। আমি চাইলেই যে-কোনো সময় কোম্পানির কাস্টমস ক্লার্ক থেকে শুরু করে জিএম কে ডেকে পাঠাতে পারি,তিনি কিছুটা সংকোচ ও বদান্যতা নিয়ে আমার কক্ষে আসেন,অপেক্ষা করেন বসার অনুমতির জন্য। না, এমন স্বৈরাচারী স্বভাব নিয়ে আমি কখনো চাকরি করিনি। কিন্তু এটাই ছিল ক্ষমতা প্রয়োগের স্বাভাবিক রীতি।

আদমজী অফিসে প্রথমদিন পা দিয়েই আমার মনমেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সারা অফিসের দেওয়াল বিশ্রীরকমের দাগ ও আাঁকিবুকিতে ভরা। ২০০৪ সালে আদমজী ইপিজেড শুরু হওয়ার সময় সে-ই যে চুনকাম করা হয়েছিল,আর কখনো রঙের পোঁচ পড়েনি। অফিস বিল্ডিংয়ের পেছনে ছোট খোলা জায়গাটা ঘন জঙ্গলে পূর্ণ হয়ে গেছে।

আমি চেয়ারে বসে প্রথম ফোনটি করলাম ইপিজেডের জিএমকে। তাঁকে সমস্যাটার কথা বললাম। কিছুক্ষণ পরই তিনি তাঁর তিনজন কর্মকর্তাকে সঙ্গে করে আমার দপ্তরে এলেন। তাঁরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে দুঃখপ্রকাশ করলেন।

পরদিনই তাঁরা কাজ ধরলেন। তিনদিনেই সহকারী কমিশনারের কার্য়ালয় সাদারঙে ঝকঝক করে উঠল। একইসাথে পেছনের জঙ্গল জায়গাটা পরিষ্কার করা হলো, ফুলের গাছ লাগানো হলো সেখানে।

তিনদিন পর ইপিজেড কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে গেলাম তাদের অফিসে। ওদিকটায় একসময় আদমজী জুট মিলসের ইডি মহোদয়ের দপ্তর ও প্রশাসনিক অফিস ছিল। এখন সে-সবের অস্তিত্ব নেই।

চা খেতে খেতে ম্যানেজার এডমিন বললেন, স্যার, আপনার অফিসটার রঙ করার বিষয়ে কেউ কোনোদিন আমাদেরকে কিছু বলেননি।
আমি মনে মনে ভাবি, তাঁরা বলেন নি,তাঁদের এতো সময় কোথায়!

এ-সবের মধ্যেই একদিন মনে হলো এখানে কর্মরত আমার স্টাফরা যারা আছে, কাস্টমস ছাড়াও আছে সিএন্ড এফের অনেক ছেলেপেলে, তারা সারাদিন কাজের মধ্যে থাকে, অবসরে তাদের মধ্যে বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। আমি কয়েকটা শিল্প প্রতিষ্ঠানের এমডি,জিএম অথবা সিনিয়র কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললাম। একটা লাইব্রেরি করব বলে নিজের আকাঙ্খার কথা বললাম। খুব ইতিবাচক সাড়া মিলল। একটা প্রতিষ্ঠান এক সপ্তাহের মধ্যেই বেশ বড়সড় একটা বইয়ের আলমারি নিয়ে এলো। আর বেশ কয়েকটা প্রতিষ্ঠান বই কেনার জন্য টাকা দিয়ে গেল। সেই টাকা দিয়ে বই কেনা হলো। আমার নিজের লেখা আর সংগ্রহে থাকা কিছু বই সেই তালিকায় যোগ হলো।আদমজী ইপিজেড কাস্টমস্ লাইব্রেরি থেকে আগ্রহী পাঠকদের বই পড়তে নেওয়ার সংস্কৃতি শুরু হলো।

এতকিছুর পরও আমার হাতে অনেক সময়। সেই সময়টাই আমি কাজে লাগালাম। আমার দরজার বাইরে একজন এমএলএসএস বসে থাকে টুল পেতে। যখন-তখন কেউ আমার রুমে প্রবেশ করতে পারে না। আমাদের লাইব্রেরির বুকশেলফে সাজানো আছে মুক্তিযুদ্ধের অনেক রেফারেন্স বই। সেগুলোর পাতা ওল্টাই। মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ লেখার কাজটা চলমান থাকে।

- Advertisement -

Latest Posts

Don't Miss

Stay in touch

To be updated with all the latest news, offers and special announcements.