
প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর ঘোষণা অনুযায়ী কানাডায় কিছু অতিরিক্ত জরুরি পণ্যে সাময়িকভাবে গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স (জিএসটি) মওকুফ করার সিদ্ধান্তে দেশের খুচরা খাতে স্বস্তির হাওয়া বইছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই পদক্ষেপ স্বল্পমেয়াদে ভোক্তাদের জন্য উপকারী হলেও তা বাস্তবায়ন করা প্রশাসনিকভাবে কঠিন ও ব্যয়সাপেক্ষ।
সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, আগামী ১৪ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কর অব্যাহার কার্যকর থাকবে। এই সময়ের মধ্যে ডায়াপার, শিশুদের পোশাক ও জুতা, প্রস্তুতকৃত খাবার, সংবাদপত্র, বই, খেলনা, ইংলিশ মাফিন, কেক, বোতলজাত পানি, পুশ ডল এবং অন্যান্য জরুরি পণ্যে জিএসটি মওকুফ করা হবে। ফেডারেল সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এই কর ছাড়ের ফলে একটি গড় পরিবার দুই মাসে প্রায় ১০০ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারবে।
রিটেইল কাউন্সিল অব কানাডার ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাট পয়রিয়ের জানান, “সরকারের এই পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। এটি ভোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দেবে, বিশেষ করে যারা ক্রমবর্ধমান জীবিকা ব্যয়ের চাপের মুখোমুখি। তবে প্রশাসনিক বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জও আছে, কারণ প্রত্যেক রিটেইলারের সিস্টেম ও সফটওয়্যার আলাদা। বড় চেইন স্টোরের জন্য পরিবর্তন সহজ হলেও ছোট বা মাঝারি ব্যবসায়ের জন্য এটি জটিল এবং সময়সাপেক্ষ।”
তিনি আরও বলেন, “পণ্যের তালিকা বিশাল কোনো ক্ষেত্রে কেবল কয়েকটি আইটেম, আবার কোথাও শতাধিক পণ্যের শ্রেণি রয়েছে। প্রতিটি আইটেম আলাদা করে ট্যাক্স হিসাব পরিবর্তন করতে হবে, যা সময় ও শ্রমের ব্যাপার। ছোট দোকানদারদের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ।”
চার্টার্ড প্রফেশনাল অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব কানাডার ভাইস প্রেসিডেন্ট জন ওকেও মন্তব্য করেছেন, “জিএসটি অব্যাহার সরাসরি ভোক্তাদের উপকার করবে, তবে সরবরাহকারী ও বিক্রেতাদের ওপর প্রশাসনিক চাপ বৃদ্ধি পাবে। তাদের দ্রুত পেমেন্ট সিস্টেম ও সফটওয়্যার আপডেট করতে হবে, যা সহজ নয়।”
অনেক খুচরা ব্যবসায়ী ইতিমধ্যেই তাদের পয়েন্ট অব সেলস (POS) সফটওয়্যারে পরিবর্তন আনতে কাজ শুরু করেছে। তবে মন্ট্রিয়ালভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান লাইটস্পিড কমার্স ইনকর্পোরেশন জানিয়েছে, “সিস্টেম পরিবর্তনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব মার্চেন্টদের ওপর। আমরা সহায়তা দিচ্ছি, তবে শেষ সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদেরই নিতে হবে।”
রিটেইল কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় প্রায় ১.৫ লাখেরও বেশি খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার বড় অংশ ছোট ও পারিবারিক উদ্যোগ। এই খাত দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ১২ শতাংশ এবং জিডিপির ৬ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখে। তাই যে কোনো কর-সংক্রান্ত পরিবর্তন সরাসরি এই খাতের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের এই উদ্যোগ স্বল্পমেয়াদে ভোক্তা খরচ বাড়াতে সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে রিটেইল সেক্টরের জন্য প্রশাসনিক ব্যয় ও প্রযুক্তিগত হালনাগাদ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। রিটেইল বিশেষজ্ঞ মারিয়া হোল্ডেন বলেন, “এটি রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত, কিন্তু বাস্তবে ছোট দোকানদারদের জন্য শ্রমসাধ্য। বড় প্রতিষ্ঠান সহজে মানিয়ে নিতে পারবে, কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিটি সফটওয়্যার পরিবর্তনই ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।”
কর ছাড়ের ফলে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো কিছুটা আর্থিক স্বস্তি পেলেও খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য এই সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষার। নতুন নিয়মে মানিয়ে নেওয়া, মুদ্রাস্ফীতির চাপ মোকাবিলা এবং প্রতিযোগিতার সঙ্গে তাল মেলানো সবকিছু মিলিয়ে ছোট ব্যবসায়ীদের চাপ আরও বাড়বে।
রিটেইল কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাট পয়রিয়ের আশাবাদী, “চ্যালেঞ্জ থাকলেও আমরা মনে করি, এই উদ্যোগ সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। গ্রাহক খুশি হলে ব্যবসায়ীরাও টিকে থাকবে এটাই বাজারের নিয়ম।”
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের এই পদক্ষেপ দেশের অর্থনীতিতে স্বল্পমেয়াদি চাঙ্গাভাব আনতে পারে, তবে কার্যকারিতা নির্ভর করবে ব্যবসাগুলোর অভিযোজন ক্ষমতা এবং বাজারে পণ্যের দামের স্থিতিশীলতার ওপর।

