
কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থা নিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট কেবল বিদেশি আগমনকারীর সংখ্যা সীমিত করার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য নয়। প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর লিবারেল সরকারের অভিবাসন নীতি ও অস্থায়ী ভিসাধারীদের সংখ্যা রেকর্ড মাত্রায় বৃদ্ধির ফলে দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৪৯ লাখ অস্থায়ী ভিসাধারীর (যার মধ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, ভিজিটর, পর্যটক এবং অস্থায়ী কর্মী অন্তর্ভুক্ত) থাকার মেয়াদ শেষ হবে। কিন্তু এর মধ্যে কতজন সত্যিই দেশে ফিরে যাবে, তা নিয়ে রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এক বড় অংশ মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসা নিয়েই দেশে থেকে যাবে, যা কানাডার জনসংখ্যা ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ওইসিডি’র (অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নত ৩৮টি দেশের মধ্যে কানাডায় ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ অভিবাসীদের দেশে ফেরার হার সবচেয়ে কম। কমপক্ষে ৪০ শতাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দেশে ফিরে না যান। তবে লিবারেল সরকারের শিথিল তদারকির কারণে এই হার এখন ৭০ থেকে ৮০ শতাংশে পৌঁছতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আগামী বছরের শেষ নাগাদ প্রায় ৭ লাখ ৬৭ হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর স্টাডি পারমিটের মেয়াদ শেষ হবে। এর মধ্যে অন্তত তিন লাখ শিক্ষার্থী কানাডাতেই থেকে যাবেন বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। তারা শিক্ষা শেষের পর পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিট বা অন্যান্য উপায়ে বৈধ থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অনেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, যা দেশের শ্রমবাজারে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করছে।
কমিউনিটি ওয়ার্কার মাসুদ আলী বাংলামেইলকে বলেন, “ভিসার শর্ত অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট সময় শেষে দেশে ফিরে যাওয়া উচিত। কিন্তু শিথিল নীতির কারণে কেউ তা মানছে না। ফলে কানাডা এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মীদের বড় অংশ কার্যত স্থায়ী বাসিন্দায় পরিণত হচ্ছে।”
অভিবাসন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল সংখ্যা সীমিত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং প্রয়োজন কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা, যা মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসাধারীদের অবস্থান চিহ্নিত করবে এবং অভিবাসন নীতির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করবে। তারা বলেন, “সরকার যদি স্পষ্ট রূপরেখা না দেয় কে থাকবে, কে যাবে তাহলে বিশৃঙ্খলা আরও গভীর হবে।”
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্থা ও শিক্ষা খাতের প্রতিনিধি মনে করাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অভিবাসীরা কানাডার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাদের অংশগ্রহণ কর্মসংস্থান, কর রাজস্ব এবং স্থানীয় ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া এই নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে
সরকারি সূত্র বলছে, ফেডারেল সরকার ২০২৬ সালের মধ্যে অভিবাসন কাঠামো পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করছে। এর আওতায় নতুন ভিসা প্রক্রিয়া, অবস্থান যাচাই এবং অস্থায়ী শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণে নীতি প্রণয়ন করা হবে। তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, “এই পরিকল্পনা কার্যকর করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা দুটোই অপরিহার্য।”
শেষ পর্যন্ত, কানাডার অভিবাসন সংকটের মূল সমস্যা সংখ্যায় নয় বরং ব্যবস্থাপনায়। যথাযথ নীতি, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ ছাড়া কেবল সীমা নির্ধারণ করলেই জটিলতা কমবে না, বরং তা আরও বাড়বে এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।

