
অন্টারিওর উত্তরাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকার হাজারো পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছে প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডের সরকার। ইলন মাস্কের মালিকানাধীন মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের সঙ্গে ১০ কোটি ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে অন্টারিও সরকার, যার মাধ্যমে স্যাটেলাইট-ভিত্তিক উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা পৌঁছানো হবে প্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে।
এই নতুন উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে “অন্টারিও স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কর্মসূচি” (ONSAT)। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হবে স্পেসএক্সের বহুল আলোচিত স্টারলিংক (Starlink) প্রযুক্তি, যা নিম্ন-কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সরবরাহ করে।
প্রাদেশিক অবকাঠামো মন্ত্রী কিঙ্গা সুরমা জানিয়েছেন, প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো এমন সব অঞ্চলকে সংযুক্ত করা, যেখানে ফাইবার অপটিক বা কেবল ইন্টারনেট পৌঁছানো এখনো প্রায় অসম্ভব। “আমরা চাই, অন্টারিওর কোনো পরিবারই যেন ডিজিটাল যুগের বাইরে না থাকে,” বলেন সুরমা।
তিনি আরও যোগ করেন, “উত্তর অন্টারিও ও গ্রামীণ এলাকায় মানুষ এখন ভিডিও কল, অনলাইন শিক্ষা, টেলিমেডিসিন ও অনলাইন ব্যবসার সুবিধা নিতে পারবে যা তাদের জীবনযাত্রায় বাস্তব পরিবর্তন আনবে।”
সরকার জানিয়েছে, সরকার যন্ত্রপাতি ও স্থাপন খরচ বহন করবে, তবে ব্যবহারকারীরা মাসিক সেবা ফি নিজেরা পরিশোধ করবেন। আগামী বছরের জুন মাসে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, আর বসন্তকাল থেকেই নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু হবে।
প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (X)-এ এক পোস্টে বলেন, “অন্টারিওর প্রতিটি নাগরিকেরই আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার অধিকার আছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা ডিজিটাল বিভাজন কমিয়ে আনব। শিক্ষা, ব্যবসা ও স্বাস্থ্যসেবায় সমান সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
তার পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় ইলন মাস্ক সংক্ষেপে মন্তব্য করেন “Cool.” সংক্ষিপ্ত হলেও, মাস্কের এই প্রতিক্রিয়া অন্টারিওবাসীর মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
ইনফ্রাস্ট্রাকচার অন্টারিওর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইকেল লিন্ডসে জানান, প্রকল্পের জন্য একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়েছিল। “আমরা প্রযুক্তি, ব্যয় এবং নির্ভরযোগ্যতার মানদণ্ডে কঠোর প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্পেসএক্সকে বেছে নিয়েছি,” বলেন লিন্ডসে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রকল্পে আদিবাসী সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। “আমরা চাই, উত্তর অন্টারিওর ফার্স্ট নেশন কমিউনিটিগুলোও এই প্রযুক্তিগত উন্নয়নের অংশ হোক। স্থানীয় প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান এবং ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানো হবে,” তিনি বলেন।
স্পেসএক্সের পক্ষে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জোয়েল চেরকিস, যিনি জানান, “স্টারলিংক সিস্টেম স্থাপন অত্যন্ত দ্রুত ও সহজ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এটি চালু করা সম্ভব, এমনকি কঠিন শীতকালেও এটি স্থিতিশীলভাবে কাজ করে।”
উল্লেখযোগ্যভাবে, স্পেসএক্স ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো অন্টারিওর পিকাঙ্গিকুম ফার্স্ট নেশন এলাকায় স্টারলিংক সেবা চালু করেছিল। বরফে ঢাকা শীতকালীন সময়ে যেখানে কেবল আকাশপথ বা বরফের রাস্তা দিয়েই যাতায়াত সম্ভব, সেখানে এই সেবা ছিল স্থানীয়দের জন্য এক প্রযুক্তিগত বিপ্লব।
বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার উপরে নিম্ন কক্ষপথে প্রতি সপ্তাহে ৪০টিরও বেশি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করছে স্পেসএক্স। ইতিমধ্যেই ৬,০০০-এরও বেশি স্টারলিংক স্যাটেলাইট সক্রিয়ভাবে কাজ করছে যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বেসরকারি স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই উদ্যোগ কেবল ইন্টারনেট সংযোগের উন্নয়ন নয় এটি ডিজিটাল সমতার এক বড় পদক্ষেপ। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং অনলাইন পেশাভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে এই প্রকল্প নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মহামারির পরবর্তী সময়ে অনলাইন নির্ভর জীবনযাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই ধরনের উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতি ও শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আনতে পারে।
বাংলামেইলের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই প্রকল্পটি অন্টারিও সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনা “কানেক্টিং অল অন্টারিও”-এরই অংশ, যার লক্ষ্য ২০২৬ সালের মধ্যে প্রদেশের প্রতিটি পরিবারকে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবার আওতায় আনা।
স্পেসএক্সের সঙ্গে এই নতুন অংশীদারিত্ব সেই লক্ষ্যের বাস্তবায়নে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা অন্টারিওকে ডিজিটাল কানাডার নতুন মানচিত্রে নেতৃত্ব দিতে সহায়তা করবে।

