
কানাডার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যা প্রতিরোধ হেল্পলাইন ৯৮৮ চালুর এক বছর পূর্ণ হলো। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই এক বছরের মধ্যে হেল্পলাইনে ৩ লাখেরও বেশি কল ও টেক্সট মেসেজ এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কানাডিয়ান সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার দ্রুত বৃদ্ধি এবং মানুষদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা ও একাকীত্ব মোকাবিলায় সহায়তা চাওয়ার মানসিকতার প্রতিফলন।
এই হেল্পলাইন ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহের সাত দিন সক্রিয় থাকে। বর্তমানে এতে ২ হাজারের বেশি প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর ও স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। তারা প্রতিদিন শত শত মানুষকে মানসিক সংকট ও হতাশা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করছেন।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার রিচমন্ডের চিমো কমিউনিটি সার্ভিসেস সংস্থার নির্বাহী পরিচালক স্লিন্ডার ভাট্টি বলেন, “আমি নিজেও এক সময় হেল্পলাইনের সাহায্য পেয়েছিলাম। তরুণ বয়সে মানসিক সংকটে একদিন পে-ফোন বুথে গিয়ে একটি ক্রাইসিস লাইনে ফোন করেছিলাম। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে একটি অচেনা নারীর কণ্ঠ বলেছিল ‘আমাকে বলতে দিন’। সেই সংক্ষিপ্ত সহানুভূতিশীল কথাটি আমাকে জীবনের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছিল।”
আজ ভাট্টিই সেই সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা সেন্টার ফর অ্যাডিকশন অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ (CAMH)-এর অংশীদার হিসেবে সারাদেশব্যাপী ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে ৯৮৮ হেল্পলাইন পরিচালনা করছে।
পাবলিক হেলথ এজেন্সি অব কানাডা ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ৯৮৮ হেল্পলাইন চালু করে। প্রাথমিকভাবে তিন বছরের জন্য ১৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য যে কেউ মানসিক সংকটে পড়লে মাত্র তিনটি সংখ্যা ডায়াল করেই তাৎক্ষণিক সহায়তা পেতে পারেন।
ফেডারেল মানসিক স্বাস্থ্য ও মাদকাসক্তি বিষয়ক মন্ত্রী ইয়ারা স্যাকস বলেন, “সংখ্যাটিই সব কিছু বলে দিচ্ছে। ৩ লাখবার কানাডিয়ানরা অনুভব করেছেন যে তারা একা নন কেউ না কেউ তাদের কথা শুনবে, বুঝবে, সাহায্য করবে।”
চিফ মেডিকেল অফিসার ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যালিসন ক্রফোর্ড জানান, “আমরা কাউকে ফিরিয়ে দিই না। মানুষ এখন জানে, যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে একজন শ্রোতা প্রস্তুত আছেন।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী বছরগুলোতে কল ও টেক্সটের সংখ্যা আরও বাড়বে, কারণ হেল্পলাইন সম্পর্কে সচেতনতা দ্রুত বাড়ছে।
তথ্য অনুযায়ী, ৯৮৮ হেল্পলাইনে প্রতিদিন গড়ে ৮০০–১,০০০টি কল ও টেক্সট আসে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ আসে কিশোর-কিশোরী ও তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের কাছ থেকে, যারা বিষণ্নতা, পারিবারিক সমস্যা, আসক্তি বা একাকীত্বে ভুগছেন। অক্টোবরে তথ্য অনুযায়ী, কোনো কলের উত্তর দিতে গড়ে ৪৪ সেকেন্ড, আর টেক্সটের উত্তর দিতে ১ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড সময় লেগেছে যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি।
ভাট্টি বলেন, “মাত্র তিনটি অঙ্কের নাম্বার হওয়ায় এটি মনে রাখা সহজ। অনেকেই নিজের জন্য নয়, বরং প্রিয়জনের জন্যও ফোন করছেন। আমরা দেখছি মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি খোলামেলা ভাবে সাহায্য চাইছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৯৮৮ শুধু একটি হেল্পলাইন নয়, এটি মানবিক যোগাযোগ পুনর্গঠনের একটি সেতুবন্ধন। এটি এমন একটি স্থান যেখানে মানুষ নিজের গল্প শেয়ার করতে পারে, বিচার বা ভয়ের বাইরে থেকে সহানুভূতি পেতে পারে।
ভাট্টি বলেন, “যখন আমি একসময় অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিলাম, তখন অপর প্রান্তের সেই কণ্ঠ বলেছিল ‘আমাকে বলতে দিন’। আজ আমি জানি, সেই বাক্যই আমার জীবন বাঁচিয়েছিল।”
ড. ক্রফোর্ড বাংলামেইলকে জানান, “৯৮৮ এখন কেবল একটি সেবা নয়, এটি একটি নিরাপদ স্থান যেখানে কেউ একা নয় সবসময় কেউ না কেউ শুনতে প্রস্তুত থাকে।”
কানাডিয়ান সমাজে মহামারি-পরবর্তী মানসিক চাপ বৃদ্ধি এবং দ্রুত পরিবর্তিত জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ৯৮৮ হেল্পলাইন এক নতুন আশা জাগিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধুমাত্র আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য নয়, বরং মানুষের মধ্যে মানবিক সংযোগ ও মানসিক সহায়তা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে কাজ করছে।

