
টরন্টোর সড়ক রাজনীতি এখন এক নতুন মোড়ে। প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডের প্রোগ্রেসিভ কনজারভেটিভ সরকার সম্প্রতি যে বিল উত্থাপন করেছে যার অধীনে কোনো মিউনিসিপালিটি গাড়ির লেন কমিয়ে বাইক লেন স্থাপন করতে চাইলে প্রাদেশিক অনুমতি নিতে হবে তা এখন শহরের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মেয়র অলিভিয়া চাউ ও টরন্টো সিটি কাউন্সিলররা একে স্থানীয় সরকারের ওপর প্রদেশের “অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ” বলে আখ্যা দিয়েছেন। বুধবারের সিটি কাউন্সিল বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে জানা গেছে, যেখানে মূল প্রশ্ন টরন্টো এই প্রাদেশিক বিলের বিরুদ্ধে কতটা আইনগত অবস্থান নিতে পারে।
প্রাদেশিক সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, টরন্টো ও আশপাশের শহরে যানজট ক্রমবর্ধমান। বাইক লেন স্থাপনের ফলে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের গাড়িচলাচলের লেন সংকুচিত হচ্ছে, যার ফলে ট্রাফিক জট আরও বেড়ে যাচ্ছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সরকারি পরিসংখ্যানে দাবি করা হয়েছে শুধু এক শতাংশ টরন্টোনিয়ান নিয়মিত সাইকেল ব্যবহার করেন, তাই পুরো সড়ক নেটওয়ার্ক পুনর্বিন্যাসের যৌক্তিকতা নেই।
প্রিমিয়ার ফোর্ডের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, এই উদ্যোগ “বাস্তবধর্মী নীতির প্রতিফলন”, যার মূল লক্ষ্য হলো গাড়ি, ট্রাক এবং বাসচালকদের চলাচল সহজ করা অর্থাৎ “কম লেন, বেশি ট্রাফিক” পরিস্থিতি থেকে শহরকে বাঁচানো।
অন্যদিকে, টরন্টোর মেয়র অলিভিয়া চাউ এই যুক্তিকে “অর্ধসত্য ও বিভ্রান্তিকর” বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, “বাইক লেন কেবল একটি পরিবহন বিকল্প নয় এটি জীবন রক্ষার প্রশ্ন। নিরাপদ সড়কব্যবস্থা গড়ে তোলা আমার দায়িত্ব, এবং আমি তা থেকে কখনো সরে আসব না।”
চাউয়ের মতে, টরন্টোর বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপিত বাইক লেনগুলো ইতিমধ্যেই দুর্ঘটনার হার কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। তিনি আরও বলেন, “আমরা প্রদেশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে চাই, কিন্তু স্থানীয় সড়ক নীতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমাদেরই থাকা উচিত। প্রদেশ যদি প্রতিটি সড়ক প্রকল্পে হস্তক্ষেপ করে, তবে স্থানীয় সরকারের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”
প্রাদেশিক পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাইক্লিস্ট গ্রুপগুলো। সংগঠন বাইক টরন্টো-এর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “শহরে নিয়মিতভাবে অন্তত পাঁচ শতাংশ নাগরিক বাইসাইকেল ব্যবহার করেন বিশেষ করে ডাউনটাউন ও মিডটাউন অঞ্চলে। বাইক লেন শুধু সাইক্লিস্টদের নয়, পথচারী ও গাড়িচালকদের জন্যও নিরাপত্তা বাড়ায়।” তারা প্রাদেশিক প্রস্তাবকে “পিছনমুখী ও পরিবেশবিরোধী” বলে অভিহিত করেছে।
সিটি কাউন্সিলররা এখন খতিয়ে দেখছেন, প্রাদেশিক বিলটি শহরের “স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন” লঙ্ঘন করছে কি না। কাউন্সিলর মারিয়া আগোস্তিনো বলেন, “ডাউনটাউন থেকে বাইক লেন তুলে দেওয়া মানে টরন্টোকে ১৯৯০-এর দশকের গাড়ি-নির্ভর সংস্কৃতিতে ফিরিয়ে নেওয়া। আমরা বহু বছর ধরে যে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়ার চেষ্টা করছি, তা এক নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যাবে।”
সিটি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রান্সপোর্টেশন ডিপার্টমেন্ট ইতিমধ্যেই এই প্রস্তাবিত আইনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করেছে।
গত সপ্তাহে সিটি হলের সামনে একাধিক পরিবেশবাদী ও সাইক্লিস্ট সংগঠন বিক্ষোভ করেছে। তাদের দাবি, “বাইক লেন তুলে ফেলা মানে শহরকে আবার যানজট ও দূষণের পুরোনো চক্রে ফেলে দেওয়া।” বিক্ষোভে অংশ নেওয়া নাগরিকরা বলেন, টরন্টো আজ যে পর্যায়ে এসেছে, সেখানে বাইক লেন শুধুমাত্র একটি অবকাঠামো নয়, বরং শহরের পরিচয়ের অংশ।
প্রাদেশিক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খসড়া আইনে উল্লেখ আছে ব্লুর স্ট্রিট, ইয়ং স্ট্রিট ও ইউনিভার্সিটি এভিনিউ-র মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক থেকে বাইক লেন তুলে গাড়ি চলাচলের লেন পুনঃস্থাপনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই তিনটি সড়ক টরন্টোর পরিবহন নেটওয়ার্কের মেরুদণ্ড, যেখানে গত কয়েক বছরে নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে বাইক লেন তৈরি করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিতর্ক এখন আর কেবল “বাইক লেন” ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই এটি টরন্টো বনাম কুইন্স পার্কের ক্ষমতার লড়াই-এর সর্বশেষ অধ্যায়।
অতীতে প্রাদেশিক সরকার জমি ব্যবহার, মেট্রোলিংক্স প্রকল্প এবং হাউজিং নীতিতে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ায় টরন্টো প্রশাসন ক্ষুব্ধ হয়েছিল। বাইক লেন বিতর্ক সেই পুরোনো টানাপোড়েনকেই আবার উস্কে দিয়েছে।
এক বিশ্লেষকের মন্তব্য অনুযায়ী, “এটি একটি প্রতীকী যুদ্ধ বাইক লেন টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে টরন্টো আসলে তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার রক্ষার জন্য লড়ছে।”
টরন্টোর রাজনীতি এখন উত্তপ্ত। একদিকে প্রাদেশিক সরকার বলছে, তারা যানজট কমাতে বাস্তবধর্মী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে; অন্যদিকে সিটি প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ বলছে, এই পদক্ষেপ শহরের পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় স্বাধীনতাকে ঝুঁকিতে ফেলবে।
আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নির্ধারিত হবে এই লড়াই শুধুই সড়ক ব্যবস্থাপনা নীতি ঘিরে, নাকি এটি টরন্টোর গণতান্ত্রিক স্বায়ত্তশাসনের ভবিষ্যৎ নিয়েও এক গভীর রাজনৈতিক সংগ্রাম।

