
আয়োজন পরিবেশ দর্শক শ্রোতা নাচ এবং গান! সব মিলিয়ে অনেকদিন পর একটা রুচিসম্মত পরিপূর্ণ অনুষ্ঠান!
গত ২৫ এপ্রিল এমএনসি এন্টারটেইনম্যান্ট এবং রেড এ্যান্ট মিডিয়ার আয়োজনে টরন্টো প্যাভিলিয়নে অনুষ্ঠিত হলো বাপ্পা মজুমদার আর এলিটা করিম এর গানের অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের দর্শক শ্রোতাদের সারিতে টরন্টোর গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। দলমত নির্বিশেষে এই সঙ্গীত সন্ধ্যা হয়ে উঠেছিল শিল্প-সংস্কৃতির এক মিলন মেলা।
দর্শক শ্রোতা সবাই সবার প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা রেখে বসছেন, চলছেন, কথা বলছেন। পুরো অডিটরিয়াম জুড়েই যেন ভালো লাগার ছন্দ।
অনুষ্ঠানসূচিতে উল্লেখ ছিল অনুষ্ঠান শুরু হবে সন্ধ্যা ৬:৩০ টায়। খুব অবাক হয়েই দেখলাম, এক মিনিটও দেরী না করে ঠিক সন্ধ্যা ৬:৩০ অনুষ্ঠান শুরু হলো ।
একটি কথা না বললেই নয় যে, কর্মব্যস্ত এই প্রবাস জীবনে দেশের শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি অদম্য ভালোবাসা থেকেই দর্শক শ্রোতা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন, সেখানে নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠান শুরু করা পারস্পরিক শ্রদ্ধার একটি বহিঃপ্রকাশ।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই গীতাঞ্জলির নৃত্যশিল্পীদের নাচের মূর্ছনায় উপস্থিত দর্শক শ্রোতা বিমোহিত। গীতাঞ্জলির নৃত্য শিল্পীদের নৃত্য প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে পরিবেশিত হলো।
এবার গানের পালা, প্রথমেই গান পরিবেশন করতে এলো টরন্টোর সবার পরিচিত ব্যান্ড ‘মানুষ’ । ‘মানুষ’ ব্যান্ড প্রায় ১ ঘন্টার মতো গান করলেন। শমি সাত্তার (কি বোর্ড) বাঁশি। টরন্টোর ছন্দের যাদুকর রাজীব (ড্রাম), টুনটুন মোস্তফা (ভোকাল), প্রাচী (ভোকাল), সাকিব (ভোকাল এবং বেকিং গিটার), মৃদঙ্গ (বেইজ গিটার), পল (বেইজ গিটার)। বিশেষ করে টুনটুন মোস্তফা’র ফোক গানে মুগ্ধ সব শ্রোতা, আর সেই সাথে রাজীব আর শমি সাত্তার এর কথা তো বলা বাহুল্য।
তারপর স্টেজে এলেন বাপ্পা মজুমদার এবং তার দলছুট আর সেই সাথে এলিটা করিম।
যদিও বাপ্পা মজুমদার নামটি বলার সাথে সাথেই সঙ্গীতের এক সুস্থ সুন্দর ধারা চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে উঠে, তারপরেও বাপ্পা মজুমদার এবং এলিটা করিমকে নিয়েই কিছু কথা না লিখলেই নয়-
বাপ্পা মজুমদার- একই সাথে সঙ্গীতশিল্পী, গীতিকার এবং সুরকার। সুস্থ সংস্কৃতির একজন বলিষ্ঠ কান্ডারী তিনি। বাবা পন্ডিত বারীণ মজুমদার (স্বাধীনতা পুরস্কার এবং একুশে পদক প্রাপ্ত) সঙ্গীত-অধ্যক্ষ, রাগসঙ্গীত বিশারদ ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পী এবং মা ইলা মজুমদার শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পীর যোগ্য সন্তান ও উত্তরসাধক বাপ্পা মজুমদার। তিনি সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ১৯৯৫ সালে তার প্রথম অ্যালবাম ‘তখন ভোরবেলা’ প্রকাশের মাধ্যমে।এযাবৎ নয়টি স্টুডিও এ্যালবাম প্রকাশ করেন এবং ২০০-এর বেশি এ্যালবামের প্রযোজনা করেন।১৯৯৬ সালে বাপ্পা
মজুমদার ও সঞ্জীব চৌধুরী ‘দলছুট’ নামে ব্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেন। সত্তা চলচ্চিত্রের গানে সুর করার জন্য ২০১৯ সালে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত সুরকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন বাপ্পা মজুমদার। সংগীতাঙ্গনে বাপ্পা মজুমদার মানেই ভিন্নধারার সুর ও গায়কীর সম্মিলন। স্রোতে গা না ভাসিয়ে চলা এই শিল্পী আত্মপ্রকাশের পর থেকে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন মানসম্মত কাজের সুবাদে।
এলিটা করিম- একই সাথে গান, সাংবাদিকতা ও রেডিও জকি হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার এক যোদ্ধা তিনি। তিনি পদ্ম পাতার জল চলচ্চিত্রের ‘একাকিনী তারা’ গানে কণ্ঠ দিয়ে শ্রেষ্ঠ গায়িকা বিভাগে বাচসাস পুরস্কার অর্জন করেন। ২০০৯ সালে গড়ে তোলেন তার নিজের ব্যান্ড ‘রাগা’। ব্যান্ডের নামেই একটি অ্যালবামও বের করেন তিনি। সাংবাদিক হিসেবে ২০০৯ সালে রেডক্রস ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন।
দিন বাড়ি যায়, আজ তোমার মন খারাপ, একটু যদি তাকাও তুমি, পরী , তুমি আমার বায়ান্ন তাস, গাড়ি চলে না” – গানগুলি নিয়ে যখন বাপ্পা মজুমদার এবং এলিটা মঞ্চে উঠলেন- একের পর এক গান !
এছাড়াও সাথে ছিল শ্রদ্ধেয় লাকি আনন্দের কালজয়ী দুটো গান, যার সুরে সময়কে পিছু ফেলে দর্শক শ্রোতারা হারিয়ে গিয়েছিল নস্টালজিয়ার সাগরে। হারানো দিনের গানসহ শ্রোতাদের মনে গেঁথে থাকা দলছুটের সব গানে অনুষ্ঠানটি সুরের যাদুতে সবাইকে সম্মোহিত করে রেখেছিল। এত্ত এত্ত সব পছন্দের গান! দুইভাগে গান পরিবেশন করলেন দলছুট। এতটা সময় ধরে একটানা গান করা! দর্শক শ্রোতাদের ভালোবাসা যে শিল্পীদের শক্তির উৎস, তা আবারও প্রমাণিত হলো।
মাঝের ছোট্ট বিরতিতে খুবই অল্প সময়ের জন্য স্পন্সর ও অর্গানাইজাররা কথা বললেন। বেশীর ভাগ অনুষ্ঠানে এই অংশটি এত বড় হয় যে, অনুষ্ঠানের প্রতি দর্শক শ্রোতাদের আগ্রহ হারিয়ে যায়। সেই জন্য আয়োজকদের বিশেষ ধন্যবাদ।
সব শেষে আবার দলছুট প্রায় দেড় ঘন্টা একের পর এক গান! বাদ্যযন্ত্রে যারা ছিলেন, তাদের কথা কি বলবো, এক কথায় অসাধারণ । বিশেষ করে দলছুট এর মাসুম ওয়াহিদুর রহমানের গিটার যেন পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে এক অন্য মাত্রা যোগ করেছিল।
বাপ্পা মজুমদার এবং এলিটা করিম আর দর্শক শ্রোতা সব মিলে যেন এক সুর! প্রতিটি দর্শক শ্রোতা কি ভীষণ তৃপ্তি আর ভালোলাগা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন! যা সবার মুখের হাসিতেই প্রকাশ পাচ্ছিল।
আয়োজকদেরকে সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আমাদেরকে এমন পরিচ্ছন্ন রুচিসম্মত চমৎকার একটা অনুষ্ঠান উপহার দেয়ার জন্য।
এই মনোমুগ্ধকর আয়োজনের জন্য বিশেষ ধন্যবাদ জানাই- এমএনসি এন্টারটেইনম্যান্ট এর কে এম আনিসুর রহমান এবং মুস্তাফিজ রহমান, রেড এ্যান্ট মিডিয়ার তাহমিদ আহমেদ এবং নওরিন তাবাস্সুম।
পুরো অনুষ্ঠানের সাউন্ড সিস্টেম অসাধারণ কাজটি পরিচালনা করেছে ড্যানফোর্থ, যাদের দক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এমন একটি সফল অনুষ্ঠান দর্শক শ্রোতারা উপহার পেতেন না।
বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতিকে বিদেশের মাটিতে সফল ভাবে বয়ে নিয়ে চলার এ পদক্ষেপে রেড এ্যান্ট মিডিয়া ২০২৪ এ টরন্টোর প্রতিবেশী শহর হ্যামিল্টনে ‘নগর বাউল- জেমস’-এর একটি সফল অনুষ্ঠান উপহার দিয়েছে।
এমএনসি এন্টারটেইনম্যান্ট ২০২৪ এ টরন্টো এবং হ্যামিল্টন দুটো শহরেই আর্টসেলের সফল অনুষ্ঠান উপহার দিয়েছে। এবারে বাপ্পা মজুমদার এবং এলিটা করিম এর অনুষ্ঠান এমএনসি এন্টারটেইনম্যান্ট ও রেড এ্যান্ট মিডিয়ার যৌথ সফল আয়োজন। দর্শক শ্রোতাদের একের পর এক সফল অনুষ্ঠান উপহার দেয়ার সাথে সাথে টরন্টোর পার্শ্ববর্তী শহরে বাংলা সংস্কৃতি পরিবেশনা এবং নতুন নতুন দর্শক শ্রোতা সৃষ্টির যে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
উদ্যোক্তাদের চেষ্টা এবং অসাধারণ দক্ষ স্বেচ্ছাসেবকদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই এই সুন্দর সন্ধ্যা উপহার পেলাম। অনুষ্ঠানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাই।
আগামীতে এমন আরো সুন্দর পরিচ্ছন্ন রুচিসম্মত অনুষ্ঠানের অনুরোধ রইলো আয়োজকদের প্রতি।

