
বাংলাদেশী অধ্যুষিত অন্যান্য পৃথিবীর নানা দেশে বৃহৎ শহরের মতো এই টরন্টো শহরেও নানা মাধ্যম-চর্চার সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে। কিন্তু অন্যান্য বৃহৎ শহরের চেয়ে কোথায় যেন টরন্টো শহরের আলাদা একটা পার্থক্য আছে। অন্যান্য বৃহৎ শহরের মতো এই শহরেও বাংলাদেশ থেকে আগত অগণিত মেধাবী পেশাজীবি আছেন৷ অধ্যাপক, প্রকৌশলী, স্থপতি, ব্যবসায়ী, ডাক্তার, চিত্রশিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ছাড়াও নানা পেশার মানুষ এদেশে এসেছেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশী এসেছেন – সংস্কৃতি কর্মী ও সংস্কৃতি বান্ধব মানুষ। তাই, টরন্টো বলতে গেলে সারাবছরই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখর থাকে। এটা সম্ভব হয় এই শহরের সংস্কৃতি বান্ধব দর্শকশ্রোতার নিরন্তর প্রেরণায় এবং উদারহৃদয় স্পনসরদের আর্থিক সহযোগিতায়৷
বাচনিক-এই টরন্টো শহরের সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রায় বা অব্যাহত সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে আবৃত্তি সংগঠন হিসেবে এক বিশিষ্ট নাম হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। একটি সংগঠন হিসেবে দশ বছর হয়তো দীর্ঘ বছর নয়। কিন্তু বিদেশবিভুঁইয়ে সময়ের হিমশিম খাওয়া কর্মব্যস্ততায় দশ বছর কম সময়ও নয়। যদি সেখানে টিমটিমে হয়ে জ্বলে থাকা নয়, বরং দীপ্ত আলোর বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে সেই সংগঠন স্বতস্ফূর্তভাবে বহু মানুষের কোলাহলে সৃষ্টিমুখর থাকে। নতুন ভাবনায় অস্থির থাকে। মানুষ ও মানবিকতার শিল্পীত ব্যক্ততার চর্চায় অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকে!
নভেম্বর ১১, ২০২৩ সাল, শনিবার সন্ধ্যায় টরন্টোয় বাচনিক যে- ‘কবিতার জোছনায় দশ বছর’ শিরোনামের যে নিবেদন করলো, তা উৎসর্গ করা হয়েছে সদ্য প্রয়াত কবি আসাদ চৌধুরীকে। নাজমা কাজী ও ফ্লোরা নাসরিন ইভার সঞ্চালনায় কবিতার জোছনার দশ বছর-এর শুরুতেই কবি আসাদ চৌধুরীর স্মরণে আলাদা একটি পর্ব পরিচালনার জন্য মঞ্চে আসেন হাসান মাহমুদ। অতঃপর এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে এই পর্ব শুরু হয়। কবি আসাদ চৌধুরীর কবিতা থেকে বৃন্দ আবৃত্তি ও কবির স্মরণে শিল্পী ফারহানা শান্তা একটি রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন। এরপরে মঞ্চে আসেন কবি পরিবার। পরিবারের পক্ষ থেকে কথা বলেন কবি পত্নী সাহানা চৌধুরী। কন্যা নুসরাত জাহান চৌধুরী শাঁওলী কবিকে নিয়ে লেখা তার একটি কবিতা পাঠ করেন। কথা বলেন কবির কনিষ্ঠ পুত্র জারিফ চৌধুরী। অবশেষে কবির বড় সন্তান আশেক ওয়াহেদ চৌধুরী আসিফ কবীর সুমনের লেখা একটি গান পরিবেশন করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, কবি আসাদ চৌধুরী শুরু থেকে আমৃত্যু টরন্টোর আবৃত্তি সংগঠন ‘বাচনিক’-এর একজন সম্মানিত উপদেষ্টা ছিলেন। কবি আসাদ চৌধুরী পর্বের শুরুর এক পর্যায়ে মঞ্চের এক পাশে রাখা কবির প্রতিকৃতিতে ফুল দেন এবং প্রদীপ প্রজ্বলন করেন হোসনে আরা জেমী ও সোমা সাঈদ।
আসাদ চৌধুরী পর্বের পর কবিতার জোছনায় দশ বছর শিরোনামের অনুষ্ঠানে সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দেন বাচনিক আহবায়ক মেরী রাশেদীন। মেরী রাশেদীনের স্বাগত বক্তব্যের পর শুরু হয় বাচনিক সম্মাননা পর্ব। উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সাল থেকে ‘বাচনিক’ কবি-কবিতা-আবৃত্তি, শিল্প-সাহিত্য বা মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ বিষয় নিয়ে গবেষণার জন্য সম্মাননার প্রবর্তন করে। বাংলা ভাষার বিশিষ্ট ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন এ বছর বাচনিক সম্মাননা -২০২৩ গ্রহণ করেন। সম্মাননা প্রদান পর্বে মঞ্চে আসেন বিশেষ অতিথি কবি ড. দিলারা হাফিজ, প্রধান অতিথি এমপিপি ডলি বেগম, বাচনিক উপদেষ্টা হাসান মাহমুদ, বাচনিক উপদেষ্টা রাশিদা মুনীর, বাচনিক উপদেষ্টা রূমানা চৌধুরী, বাচনিক উপদেষ্টা দেলওয়ার এলাহী, বাচনিকের নির্বাহী সদস্য কাজী হেলাল ও বাচনিক নির্বাহী সদস্য জামিল বিন খলিল। সম্মাননা পর্বে মানপত্র পাঠ করেন মেরী রাশেদীন। সম্মানিতকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান রাশিদা মুনীর। উত্তরীয় পরিয়ে দেন – রূমানা চৌধুরী। ডলি বেগম তার বক্তব্যে লুৎফর রহমান রিটনকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান। কবি দিলারা হাফিজ তার বক্তব্যে বাচনিক ও রিটনকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে তাঁর মরহুম স্বামী প্রখ্যাত কবি বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক আজাদের কথা স্মরণ করেন। রিটন ও দিলারা হাফিজ পরস্পরকে ওস্তাদ সম্বোধনের প্রেক্ষাপটও তিনি তুলে ধরেন। বাচনিক সম্মাননায় ভূষিত ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন তার বক্তব্যে কবি আসাদ চৌধুরীকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করেন৷ রিটন বলেন – উপস্থিত না থেকেও বড় বেশী করে আসাদ চৌধুরী ছড়িয়ে আছেন এখানে। রিটন আরো বলেন – আমার এই সম্মাননা প্রাপ্তিতে সবচেয়ে বেশী খুশি হতেন আসাদ চৌধুরী! রিটন সাম্প্রতিক সময়ে তার ব্যক্তিগত নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন৷ রিটনের বক্তব্য দারুণভাবে উপভোগ্য হয়। হাস্যরসে মানুষ ফেটে পড়েন।
সম্মাননাপর্বের পরে বাচনিকের শিল্পীদের পরিবেশনায় শুরু হয় আবৃত্তি। আবৃত্তি পর্বের এক পর্যায়ে একটি রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন শিখা আখতারী আহমাদ।
আবৃত্তিতে অংশগ্রহণ করেন অরুনা হায়দার, ইরা নাসরিন, কাজী হেলাল, কামরুন নাহার হীরা, কামরান করিম, জাহিদা খানম সোমা, জামিল বিন খলিল, ডটি শারমিন, তন্ময় রহমান, ফারহানা আহমদ, ফাতেমা খাতুন ইথার, মেরী রাশেদীন, লীনা আগ্নেস ডি কস্টা, রাশিদা মুনীর, শাপলা শালুক, শিখা আখতারী আহমাদ, সুমি রহমান, সম্পূর্ণা সাহা, হাসিনা হানিফ হাসি।
ভলান্টিয়ারে ছিলেন হোসনে আরা জেমী, আরিয়ান হক, অরুনা হায়দার, রেবা আহমেদ, বিন্দু চৌধুরী, প্রতিমা সরকার, ইত্তেজা আহমেদ টিপু, নিগার সুলতানা, জারিফ বিন খলিল ও অরুনিম আহমেদ।
ভিডিওগ্রাফি : রাশেদ শাওন। ফটোগ্রাফি : রাহাদ উদ্দিন। সাউণ্ড : ড্যানফোর্থ সাউণ্ড।
যাঁদের উদারহৃদয় অর্থ সহযোগিতায় পুরো অনুষ্ঠান, সেই স্পন্সররা হলেন : ওমর হাসান আল জাহিদ, চয়নিকা দত্ত, তানভির নাওয়াজ, শামীম আরা, মিঠু সোম-সুবর্ণা দে, মোহাম্মদ টুলু হোসেন, রাকিব রাশেদীন, সাকিব আলম, গোপা চৌধুরী, শামস মোহাম্মদ শামসুদ্দিন, সাবিনা শারমিন।
আবৃত্তি অনুষ্ঠানে যন্ত্রানুসঙ্গত করেন : শিল্পী রূপতনু শর্মা, শিল্পী রনি পালমার।
শুরু থেকে সাংগঠনিকভাবে বাচনিকের সঙ্গে আছেন, এমন কয়েকজন আবৃত্তিশিল্পীকে দশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সম্মানিত করে ক্রেস্ট দেওয়া হয়। সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিখা আখতারী আহমাদ।
অনুষ্ঠানে আবৃত্তির সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন : জেমস প্রিসা, অরুনা হায়দার।
বাচনিকের সকল পোস্টার, প্রচার, ট্রেইলার, গ্রাফিকস, প্রোজেক্টর প্রদর্শন করেন জামিল বিন খলিল। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে সমাপনী বক্তব্য দিলে দর্শকশ্রোতারা মেরী রাশেদীনকে বিপুল করতালির মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানান। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নাজমা কাজী ও ফ্লোরা নাসরিন ইভা। পরিকল্পনা ও পরিচালনা করেন মেরী রাশেদীন। অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট রচনা করেন দেলওয়ার এলাহী।

