রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ১২:৪৪ am

শুভ জন্মদিন স্যার

শুভ জন্মদিন স্যার

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের যৌথ উদ্যোগে নাটকের উপর সপ্তাহব্যাপী একটি কর্মশালা হচ্ছে। সময় : এরশাদীয় স্বৈরশাসনের কোন এক বছর।

 

বিভিন্ন নাট্য সংগঠন থেকে দুজন তিনজন করে এই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন। 'কারক নাট্য সম্প্রদায়' থেকে শংকরদা আমাকে আর আমার বন্ধু বাবু ও শহীদুলকে কর্মশালায় যেতে বললেন। আমরা তিনজন সেই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করলাম।

 

প্রতিদিন সন্ধ্যায় এই কর্মশালায় নাটক বিষয়ে একটি লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করতেন একেকজন নাট্যজন, প্রাগ্রসর বুদ্ধিজীবী-প্রাবন্ধিক। প্রতিটি প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর প্রবন্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হতো। অংশগ্রহণকারীদের যে কেউ কোন জিজ্ঞাসা থাকলে অবলীলায় জানতে চাইতেন।

 

সাজেদুল আউয়াল, সুশান্ত মজুমদার, শান্তনু কায়সার, হুমায়ূন ফরীদি, সুবর্ণা মুস্তফা, মফিদুল হক ও ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কর্মশালায় লিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছিলেন।

 

ফরাসি দেশের প্যারিতে তখন পিটার ব্রুক স্ট্যানিস্লোভাস্কি ও ব্রেখট স্কুল থেকে ভিন্ন আঙ্গিকে নাটককে মঞ্চে উপস্থাপনের পরীক্ষানিরীক্ষা করে সারাবিশ্বের নাট্যামোদীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে এই নবতরঙ্গের চাঞ্চল্যের ঢেউ আমাদের ঢাকা শহরেও চর্চায় না হলেও কারো কারো আলোচনায় ফিরে ফিরে এসেছে। প্যারিসে পিটার ব্রুককৃত মহাভারতের প্রযোজনা ও মঞ্চস্থ বিষয়ে সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। তাই, পিটার ব্রুক সম্পর্কে তখন আমার উৎসুক মনে অনেক জিজ্ঞাসা উঁকি দিয়েছে।

 

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার অনেক বছর হলো কানাডার কিংস্টন শহরে কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Ph.D ডিগ্রি নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। উজ্জ্বল অধ্যাপক। তুখোড় বক্তা। শানিত যুক্তির প্রাবন্ধিক। বহুদা বিস্তৃত তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণা। গোগ্রাসে তা গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না; বরং আমাদেরকেও জানানোর তাগিদ নিয়ে লিখে চলেছেন অত্যুজ্জ্বল সব মনোহর ভাষার প্রবন্ধ। কী নেই সেই প্রবন্ধের বিষয়ে? নন্দনতত্ত্ব, ইংরেজী সাহিত্যের সমকালীন কবি ও কবিতা, রবীন্দ্রনাথ, চিত্রকলা ও নাট্যতত্ত্ব-নাট্যজন-নাটক। এমনকি অধ্যাপক আহমদ শরীফের রবীন্দ্র মূল্যায়ন নিয়েও স্যারের লিখিত প্রবন্ধ তখন রবীন্দ্র অনুরাগী ও বামপন্থী ভাবুকদের আলোচনার বিষয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী সাহিত্যের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছাত্রছাত্রীদের কাছে যেমন জনপ্রিয় তেমনি সারাদেশের সারস্বত সমাজেও সমাদৃত ও সম্মানিত। অন্য অনেকের মতো আমার কাছে যে কোন সেমিনার সিম্পোজিয়ামে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের উপস্থিতি ছিল অনেক আনন্দের। প্রবল আগ্রহ নিয়ে তাঁর বক্তৃতা শুনি।

 

কর্মশালায় একদিন প্রবন্ধ উপস্থাপন করলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার। প্রবন্ধ নিয়ে পাঠ শেষে আলোচনা হলো। প্রশ্নোত্তর পর্বে অনেকে অনেক কিছু জানতে চাইলেন। জানলেন। আমি স্যারের কাছে পিটার ব্রুক সম্পর্কে কিছু একটা লিখিত প্রশ্ন দিয়ে জানতে চেয়েছিলাম। স্যার সেদিন বলেছিলেন পিটার ব্রুক সম্পর্কে তাঁর চেয়ে অধিক জানেন হুমায়ূন ফরীদি ও সুবর্ণা মুস্তফা। স্যার আরো বলেছিলেন প্রশ্নটি সুন্দর এবং এ ব্যাপারে তাঁরও জানার আগ্রহ প্রবল।

 

সেদিনের সেশনে হুমায়ূন ফরীদি ও সুবর্ণা মুস্তফা ছিলেন না। অতএব, এ বিষয়ে সেখানেই ঐ জিজ্ঞাসার সমাপ্তি হয়েছিল। কিন্তু, আমার কাছে উদিত হয়েছিল মহৎপ্রাণ এক জ্ঞানতাপসের। সারাদেশে সারস্বত সমাজে স্বাগত এক উজ্জ্বল বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আমার জিজ্ঞাসাকে কথার ফুলঝুরি দিয়ে মিটিয়ে দিতে পারতেন। পারতেন তাঁর সাধ্যমতো জানার পরিধি থেকে কিছু বলে নিজের দায় মিটিয়ে দিতে। স্যার তা করেননি। বরং এই নির্দিষ্ট বিষয়ে তাঁর চেয়ে অধিক জানার দু'জন অভিনেতাকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন সম্মানের সাথে!

 

আজ ভাবলে অবাক লাগে আত্মগরিমাকে কতটুকু শাসন করতে জানলে এভাবে ভাবা সম্ভব? অন্যের জানাকে কতটুকু সম্মান করতে জানলে কম জানাকে প্রকাশ করে নিজেকে মহত্ত্বম করা সম্ভব? সেদিন থেকে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার আমার সরাসরি শিক্ষক না হয়েও অন্তঃস্থলের গুরু। উদাহরণীয় এক মহত্তম প্রাণ। কি ছিল সেই লিখিত জিজ্ঞাসায়? এখন আর তা মনে নেই!

 

আজ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের জন্মদিন।

 

জন্মদিনে স্যারের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা। দূরের অভিবাদন।

 

১৮ জানুয়ারি ২০২১

Comments