Sat 28th Nov 2020, 1:40 am

দেশ না বিদেশ

দেশ না বিদেশ

সালাহ উদ্দিন শৈবাল

আজকে টরন্টো এবং এর আশেপাশের শহরের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বাতাস কখনো কখনো ১০০+ কিমি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ড্রয়িংরুমের বড় জাানালায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। ক্ষুব্ধ বাতাস পাগলের মতো ঘুরছিল। ঝড়া পাতা উড়ছিলো। ডালগুলো নুয়ে নুয়ে পড়ছিলো। কি ভীষন শব্দ বাতাসের! সংগে বৃষ্টি..বেশ ঘন বৃষ্টি। একটু ভয় ভয় লাগছিলো। বাংলাদেশে এরকম হলেই বিদ্যুৎ চলে যেত। এখানেও যায়। তবে সব সময় না। যদি কোথাও তার-টার ছিঁড়ে যায়।

ফোন বাঁজছে। দেশ থেকে। অপরিচিত নম্বর। অন্য সময় হলে ধরা হতো না। এখন ধরতে ইচ্ছা হলো। কথা বলি কারো সংগে। ঝড় দেখে কি লাভ?

আমার এক পরিচিত ভাই। বয়সে আমার সামান্য বড় হতে পারেন। নাও পারেন।

শৈবাল..কানাডা ইমিগ্রেশন চিন্তা করছি। তুমি কি বলো? চাকরী কেমন? জীবন কেমন?

আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। দেশের অবস্থা কি ভালো না? গত কয়েক মাসে প্রায় ১০টার উপরে এই ধরণের কল পেয়েছি। গত দশ বছরে আমি দেখেছি দেশে মানুষ অস্বস্থিতে থাকলে এই ধরনের কল বেড়ে যায়। ভালো সময় যারা ফোন করেএমনি কথা বলার জন্য.তাদের কথা থাকে ভিন্ন ধরনের

শৈবাল.তুমি খালি খালি দেশ ছাড়লা। দেশেতো ভালোই ছিলা।

সেই সময় তাদের গলায় ভরসা থাকে। কিছু দিন হলো ভরসা কম দেখছি। জানিনা..আমার থিউরী ভুলও হতে পারে। আমি চাই ভুল হোক। দেশ ভালো নেই এটা জানতে আমার ভালো লাগে না।

দেশ ছাড়ার জন্য কেউ ফোন করলে আমি চুড়ান্ত অস্বস্থিতে পড়ে যাই। কারন খুব জটিল না। খুব সাধারন। যারা ফোন করেন তারা আমার কাছে হ্যাঁ বা না উত্তর আশা করেন। পৃথিবীর লক্ষ কোটি অমীমাংসিত রহস্যের মতো দেশ না বিদেশ এই রহস্যের কোন একটা নির্দিষ্ট উত্তর নেই। কেউ বিদেশ এসে অনেক ভালো আছে। কেউ বিদেশে এসে ভালো নেই। কেউ দেশে থেকে অনেক ভালো আছে। কেউ দেশে থেকে ভালো নেই।

বেশির ভাগ মানুষ বলে..আমাদের কথা বাদ দাও। ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য আসছি।

আমি চুপচাপ শুনি। কারন আমি জানি দেশে যারা থেকে যাবে তাদের অনেকের ছেলে মেয়েও অনেক ভালো করবে। দেশ বিদেশে অনেক নাম করবে। বিদেশে যারা চলে আসবে তাদের ছেলে মেয়েও অনেক বড় কিছু করবে। ভালো থাকবে। কিন্তু এরপরও দেশে থাকা এবং বিদেশে চলে আসা কারো কারো ছেলে মেয়ে হয়তো খুব ভালো থাকবে না। এই কিছু দিন আগে টরন্টো শহরের এক বাংলাদেশী পরিবারের মা-বাবা-বোন-দাদী সবাই কে এক সাথে হত্যা করেছে তাদেরই যুবক ছেলে। যার ভবিষ্যতের জন্যই হয়তো বাবা-মা দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে এসেছিলো। দেশ থাকলেও কি এমন হতো? জানি না।

রাজার বাড়ী একশ চরকা ঘড় ঘড় করে,

একটা চরকা নড়লে পড়ে লক্ষ সুতা নড়ে।

রাজার বাড়ীর লক্ষ সুতা চেনার সমার্থ মানুষের নাই। তাহলে?

তাহলে আর কি? সব সময়তো আর রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। মোড় আসলে বিচার বিশ্লেষন করে ডান-বাম সিদ্ধান্ত নিতেই হয়। সেই সিদ্ধান্ত আবার মানুষ পাল্টায়ও। একবার না। বারবার। আমি আমার কানাডা জীবনে-

· দেশ থেকে চলে আসা লোক দেখেছি।

· দেশ থেকে চলে এসে আবার ফিরে যাওয়া লোক দেখেছি।

· দেশ থেকে চলে এসে..ফিরে গিয়ে..আবার চলে আসা লোক দেখেছি।

· দেশ থেকে চলে এসে..ফিরে গিয়েআবার চলে এসেআবার ফিরে যাওয়া লোক দেখেছি!

· ………চলবে………………………………………!!!!

জীবন আসলে একেক জনের কাছে একেক রকম। কেউ শুধু গন্তব্য খোঁজে। কেউ অল্প বিস্তর জার্নি খোঁজে। কেউ কেউ পুরাই যাযাবর হয়ে যায়। সবাই যার যার জীবন বেঁচে থাকে। সবাই যার যার পথে চলে। প্রত্যেকের পথ আলাদা। এক জনের সংগে আরেক জনের জীবন পাল্টানোর কোন উপায় প্রকৃতি রাখে নি। সম্ভব না।

তাই তথ্য নিন। পরামর্শ নিন। মতামত নিন। কিন্তু সিদ্ধান্ত??……যেটা আপনার ভালো লাগে। যেটা আপনার মন চায়।

আমি কানাডা আসার আগে বন্ধুআত্মীয়অনেক তথ্য আমার কাছে ছিল। কেউ হ্যাঁকেউ না

একদিন সন্ধ্যায় বাসার ছাদে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঢাকা শহরে চুপচাপ সন্ধ্যা নামছিলো। বাড়ীতে বাড়ীতে আলো জ্বলে উঠছিলো। আমার মন বিক্ষিপ্ত। সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না।

আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হলো..এই..একই বির্স্তীন আকাশ কতো দেশে দেশে ছড়িয়ে আছে.সেদেশে বৃষ্টি হয়..রোদ উঠে.তারা ফোঁটে। শহরে শহরে মানুষ থাকে। তারা তাদের বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যায়। বাসার জানালায় দাঁড়িয়ে ঝড় দেখে.আমি সেই সব জীবন না দেখে মরে যাবো?

ছন্দকে বললাম। সে হেসে বললো..চলো..যেয়েই দেখি।

এইটা আমাদের কথা। এইটা তাই আমাদের জীবন।

আর-কিছু দেখেছি কি: একরাশ তারা-আর-মনুমেণ্ট-ভরা কলকাতা?

চোখ নিচে নেমে যায় চুরুট নীরবে জ্বলে বাতাসে অনেক ধুলো খড়;

চোখ বুজে একপাশে সরে যাই গাছ থেকে অনেক বাদামী জীর্ণ পাতা

উড়ে গেছে; বেবিলনে এক-একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর

কেন যেন; আজো আমি জানিনাকো হাজার-হাজার ব্যস্ত বছরের পর।

- জীবনানন্দ দাশ

 

Comments